খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২০ জুন ২০২৬
ভারতে সাধারণ বীমা খাতের প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাসে দেশটির সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলোর মোট প্রত্যক্ষ প্রিমিয়াম আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮.৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২৪ হাজার ১৯৪ কোটি ৫৬ লাখ রুপিতে পৌঁছেছে। ভারতের জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কাউন্সিলের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, অর্থনৈতিক পরিবর্তনশীলতা সত্ত্বেও ভোক্তাদের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বীমার আওতা সম্প্রসারণে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ এই প্রবৃদ্ধিকে উল্লেখযোগ্যভাবে সহায়তা করেছে।
মে মাসে সাধারণ বীমা খাতের প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি ছিল স্বাস্থ্য বীমা খাত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই খাত সাধারণ বীমা শিল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। মে মাসে স্বতন্ত্র স্বাস্থ্য বীমা কোম্পানিগুলোর প্রিমিয়াম আয় বছরে ৩১.৭৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৩ হাজার ৮৪২ কোটি ৪১ লাখ রুপিতে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলোর সামগ্রিক প্রিমিয়াম আয় ৫.৮৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২০ হাজার ৩৪৫ কোটি ৯০ লাখ রুপিতে পৌঁছেছে। এতে খাতটির বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রবৃদ্ধির হারের একটি স্পষ্ট পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়েছে।
প্রধান বীমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠান আইসিআইসিআই লোম্বার্ড উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। মে মাসে কোম্পানিটির প্রিমিয়াম আয় ১১.৫৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২ হাজার ৪০৫ কোটি ৩ লাখ রুপিতে দাঁড়িয়েছে। বহুমুখী পণ্যসেবা এবং শক্তিশালী বিপণন নেটওয়ার্ক তাদের এই প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর বিপরীতে ভারতের বৃহত্তম সাধারণ বীমা প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন নিউ ইন্ডিয়া অ্যাস্যুরেন্সের প্রিমিয়াম আয় মাত্র ০.০৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২ হাজার ৯৪৫ কোটি ৬৪ লাখ রুপিতে পৌঁছেছে। এটি সামগ্রিক বাজার সম্প্রসারিত হওয়ার মাঝেও সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ওপর বেসরকারি খাতের প্রতিযোগিতামূলক চাপ বৃদ্ধির স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (এপ্রিল-মে) সাধারণ বীমা খাতের ব্যবসায়িক অগ্রগতির চিত্র এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মে মাসের প্রিমিয়াম আয়ের পরিসংখ্যান নিচে ছক আকারে উপস্থাপন করা হলো:
| খাতের বিবরণ / প্রতিষ্ঠানের নাম | ২০২৬ সালের মে মাসের প্রিমিয়াম আয় (কোটি রুপি) | বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার (%) |
| সামগ্রিক সাধারণ বীমা খাত | ২৪,১৯৪.৫৬ | ৮.৭% |
| স্বতন্ত্র স্বাস্থ্য বীমা কোম্পানিগুলো | ৩,৮৪২.৪১ | ৩১.৭৪% |
| সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলো (যৌথ) | ২০,৩৪৫.৯০ | ৫.৮৫% |
| আইসিআইসিআই লোম্বার্ড (বেসরকারি) | ২,৪০৫.০৩ | ১১.৫৯% |
| নিউ ইন্ডিয়া অ্যাস্যুরেন্স (সরকারি) | ২,৯৪৫.৬৪ | ০.০৩% |
চলতি অর্থবছরের এপ্রিল-মে সময়ে সাধারণ বীমা খাতের মোট প্রিমিয়াম আয় সামগ্রিকভাবে ৬.৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৫৯ হাজার ৬১২ কোটি ৯০ লাখ রুপিতে দাঁড়িয়েছে। একই দুই মাসের সময়কালের মধ্যে স্বতন্ত্র স্বাস্থ্য বীমা কোম্পানিগুলোর আয় বৃদ্ধি পেয়েছে ৩৪.০৩ শতাংশ। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, বীমা সুরক্ষার আওতা বাড়ানো, নতুন পণ্য উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সম্প্রসারণে সরকারের উদ্যোগের ফলে পুরো অর্থবছরজুড়েই এক অঙ্কের উচ্চ প্রবৃদ্ধি (হাই সিঙ্গেল ডিজিট গ্রোথ) অব্যাহত থাকতে পারে।
বর্তমানে ভারতের সাধারণ বীমা বাজারে স্বাস্থ্য বীমা খাতটি মোটর বীমাকেও ছাড়িয়ে সবচেয়ে বড় খাতে পরিণত হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্কারের ফলে বীমা সুরক্ষার পরিধি বৃদ্ধি, পূর্ববর্তী রোগের ক্ষেত্রে অপেক্ষার সময় কমানো এবং প্রবীণ ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য বীমা আরও সহজলভ্য হওয়ায় এই খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। তবে মোটর বীমা এখনও সাধারণ বীমা খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে রয়েছে। তৃতীয় পক্ষের দায়বদ্ধতা বীমা (থার্ড পার্টি লাই্যাবিলিটি ইন্স্যুরেন্স) বাধ্যতামূলক হওয়া এবং সামগ্রিক যানবাহন বিক্রি বৃদ্ধি, বিশেষ করে বৈদ্যুতিক যানবাহনের (ইভি) প্রসার এই খাতকে শক্তিশালী অবস্থানে রেখেছে। এর পাশাপাশি অগ্নি, সামুদ্রিক ও প্রকৌশল বীমার মতো বাণিজ্যিক খাতগুলোও ঝুঁকিভিত্তিক মূল্য নির্ধারণে (রিস্ক-বেসড প্রাইসিং) অধিক স্বাধীনতা পাওয়ায় ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কোভিড-পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি, চিকিৎসা ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি, নগদবিহীন চিকিৎসা ব্যয় নিষ্পত্তি (ক্যাশলেস সেটলমেন্ট) সুবিধা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সহজে বীমা গ্রহণের সুযোগ বৃদ্ধির কারণে স্বাস্থ্য বীমার চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এছাড়া মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, দ্রুত নগরায়ণ এবং আর্থিক সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক উভয় পর্যায়েই বীমা গ্রহণের প্রবণতা বাড়ছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও অনলাইন বীমা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকদের জন্য বীমা গ্রহণকে আরও সহজ ও স্বচ্ছ করে তুলেছে।
তবে এই প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি খাতটির সামনে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি (মেডিকেল ইনফ্লেশন), পরিণত বাজারে তীব্র মূল্য প্রতিযোগিতা এবং দাবি ব্যবস্থাপনার (ক্লেম ম্যানেজমেন্ট) দক্ষতা উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা কোম্পানিগুলোর লাভজনকতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইআরডিএআই (IRDAI) গ্রাহক সুরক্ষা, অভিযোগ নিষ্পত্তি, উদ্ভাবনে উৎসাহ প্রদান এবং কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি অব্যাহত রেখেছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী বছরগুলোতেও ভারতের সাধারণ বীমা খাত এই শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি বজায় রাখবে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বীমা বাজারে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যে এগিয়ে চলা ভারতের জন্য এই প্রবৃদ্ধি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অন্যান্য অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে আর্থিক সুরক্ষা জোরদার করার পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিভিন্ন উৎপাদনশীল খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বৃদ্ধিতেও সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।