খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 23শে আশ্বিন ১৪৩২ | ৮ই অক্টোবর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বাংলা ভাষার ইতিহাসে কিছু নাম কখনো মুছে যায় না। তারা হয়ে থাকেন সংগ্রামের প্রতীক, সাহসের প্রতিচ্ছবি, এবং মাতৃভাষার অমর রক্ষক। সেই অমর নামগুলির অন্যতম ভাষাসৈনিক আব্দুল মতিন, যিনি ‘ভাষামতিন’ নামেই আমাদের স্মৃতির ভেতর চিরস্থায়ী হয়ে আছেন।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল কেবল রাষ্ট্রভাষার প্রশ্ন নয়। এটি ছিল একটি জাতির আত্মপরিচয়ের লড়াই। এই ঐতিহাসিক আন্দোলনের প্রতিটি ধাপে, প্রতিটি সিদ্ধান্তে, প্রতিটি আহ্বানে ছিলেন এক তরুণ ছাত্রনেতা। তিনি ছিলেন সেই সময়ের দৃঢ় কণ্ঠস্বর, যিনি প্রথম উচ্চারণ করেছিলেন—“রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।”
আব্দুল মতিনের জন্ম ১৯২৬ সালের ৩ ডিসেম্বর, সিরাজগঞ্জ জেলার চৌহালি উপজেলার ধুবালিয়া গ্রামে, এক মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারে। তাঁর পিতা আব্দুল জলিল, মাতা আমেনা খাতুন। ছেলেবেলা থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী, স্পষ্টভাষী ও দৃঢ়চেতা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৫২ সালের উত্তাল ফেব্রুয়ারিতে, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে যখন পূর্ববাংলার ছাত্রসমাজ একত্রিত হচ্ছিল, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন আব্দুল মতিন।
২১ ফেব্রুয়ারি কলাভবনের ঐতিহাসিক সভায় সভাপতিত্ব করে তিনি ঘোষণা দেন ১৪৪ ধারা অমান্য করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার। এই সাহসী সিদ্ধান্তের ফলেই বাংলা ভাষার ইতিহাসে লেখা হয় এক নতুন অধ্যায়—যা পরে রক্তে লেখা হয়েছিল সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ আরও বহু ভাষাসৈনিকের আত্মত্যাগে।
ভাষা আন্দোলনের পরও আব্দুল মতিন থেমে থাকেননি। তিনি ছাত্র ইউনিয়ন গঠনের উদ্যোগ নেন, সংগঠনের সভাপতি হন, এবং পরবর্তী প্রজন্মকে অনুপ্রেরণা দেন সাহস, যুক্তি ও আত্মমর্যাদার শিক্ষা দিয়ে। তাঁর রাজনীতি কখনো ব্যক্তিস্বার্থ বা ক্ষমতার জন্য ছিল না। এটি ছিল মানবিক ন্যায়বোধ ও স্বাধীন চিন্তার প্রতিফলন।
শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সমাজচিন্তায়ও ছিল তাঁর গভীর দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি ছিলেন একাধারে লেখক, চিন্তক এবং সংগ্রামী নাগরিক। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—
‘ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস’, ‘বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন’, ‘বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজ’, ‘আমার দেখা রাজনীতি’।
এই গ্রন্থগুলো আমাদের ইতিহাসচর্চার এক অনন্য দলিল, যেখানে আন্দোলনের পটভূমি, দর্শন ও ত্যাগের কাহিনি পাওয়া যায় প্রত্যক্ষ সূত্রে।
ভাষাসৈনিক আব্দুল মতিনের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে ২০০১ সালে প্রদান করা হয় বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান “একুশে পদক”। তবে পুরস্কারের চেয়েও বড় স্বীকৃতি হলো তাঁর নামের পাশে জুড়ে থাকা উপাধি—‘ভাষামতিন’, যা একটি ভালোবাসা, একটি শ্রদ্ধা, একটি ইতিহাসের প্রতীক।
৮ অক্টোবর ২০১৪ সালে ঢাকায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তি ভাষাসৈনিক। তাঁর মৃত্যু কেবল একজন মানুষের মৃত্যু নয়—এটি ছিল এক সংগ্রামী যুগের সমাপ্তি, একটি অগ্নিমুখর ইতিহাসের নীরব প্রস্থান।
আজও যখন আমরা একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাতে শহীদ মিনারে ফুল দেই, যখন শিশু-কিশোররা কণ্ঠে তোলে—
“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি…”
তখন মনে পড়ে যায় সেই তরুণ মতিনকে, যিনি প্রথম বলেছিলেন—
“বাংলা আমার ভাষা, বাংলাই হবে রাষ্ট্রভাষা।”
ভাষাসৈনিক আব্দুল মতিন—
তাঁর কণ্ঠে ছিল প্রতিবাদের বজ্রধ্বনি,
তাঁর কলমে ছিল ইতিহাসের নথি,
আর তাঁর জীবনে ছিল এক অনন্য আদর্শ—নিজ মাতৃভাষার জন্য নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।
তিনি শুধু ভাষাসৈনিক নন,
তিনি আমাদের চেতনার প্রহরী,
আমাদের প্রজন্মের অনুপ্রেরণার উৎস।
শ্রদ্ধাঞ্জলি।
ভাষার জন্য যিনি জীবনভর লড়েছিলেন,
তাঁর স্মৃতিই আজ আমাদের হৃদয়ের ভাষা।