খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৯ জানুয়ারি ২০২৬
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে এগোতে না যেতেই দেশজুড়ে ভোটকেন্দ্রিক সহিংসতা এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির খবর বেড়েই চলেছে। চোরাগোপ্তা হামলা, গুলি, হত্যাকাণ্ড, বিস্ফোরণ, মব সন্ত্রাস এবং অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার—এসব ঘটনা ভোটের আগে সাধারণ মানুষ, প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহেই অন্তত চারটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যা আইনশৃঙ্খলার প্রতি মানুষের আস্থা কমিয়ে দিয়েছে।
রাজধানীর ফার্মগেট ও কারওয়ান বাজার এলাকা থেকে খুব কাছে তেজতুরী বাজারে বুধবার রাতে গুলিতে স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতাকে হত্যা করা হয়। বৃহস্পতিবার দুপুরে গাজীপুরে এনসিপির এক কর্মীকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে তাঁর মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়েছে দুর্বৃত্তরা; তিনি অল্পের জন্য রক্ষা পান। এর আগের দিন শরীয়তপুরের জাজিরায় একটি ঘরে বিস্ফোরণে দুই যুবক নিহত হন। পুলিশ জানিয়েছে, বিস্ফোরণটি ককটেল তৈরির সময় ঘটেছে। তবে এসব ককটেল নির্বাচনী প্রচারে হামলা বা নাশকতার জন্য তৈরি হচ্ছিল কি না, তা এখনও তদন্তাধীন।
২৬ ডিসেম্বর ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে এক বাড়িতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। একতলা ভবনের দুটি কক্ষ ধ্বংস হয়ে যায়। ঘটনাস্থল থেকে ককটেল, রাসায়নিক দ্রব্য ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, মাদ্রাসা পরিচালনার নামে ভাড়া করা ওই বাড়িতে তৈরি করা বোমা আগে বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়েছিল।
রাজধানীসহ দেশের অন্যান্য স্থানে মব সন্ত্রাসের ঘটনায় নিরাপত্তার সংকট আরও গভীর হয়েছে। ৩১ ডিসেম্বর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় মোটরসাইকেলের সঙ্গে গাড়ির ধাক্কাকে কেন্দ্র করে আইনজীবী নাঈম কিবরিয়াকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। একই রাতে শরীয়তপুরের ডামুড্যায় ব্যবসায়ী খোকন চন্দ্র দাসকে কুপিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।
নিচের টেবিলে সাম্প্রতিক নির্বাচনী সহিংসতার কিছু প্রধান ঘটনা তুলে ধরা হলো:
| তারিখ | স্থান | ঘটনা | মৃত/আহত |
|---|---|---|---|
| ১৮ ডিসেম্বর | ময়মনসিংহের ভালুকা | ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা | ১ |
| ১৯ ডিসেম্বর | লক্ষ্মীপুর | বিএনপি নেতার বাড়িতে আগুন, শিশু নিহত | ১ |
| ৩১ ডিসেম্বর | ঢাকা, বসুন্ধরা | মোটরসাইকেলের ধাক্কা, আইনজীবী পিটিয়ে হত্যা | ১ |
| ৭ জানুয়ারি | ঢাকা, তেজতুরী বাজার | স্বেচ্ছাসেবক নেতা গুলিতে হত্যা | ১ |
নির্বাচনী সহিংসতা ও মব সন্ত্রাসের সঙ্গে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার যুক্ত হয়ে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা অনুভূতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২’-এর আওতায় ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৫,৯৩৬ জন গ্রেপ্তার হলেও পেশাদার সন্ত্রাসী ও বড় অস্ত্র উদ্ধার সীমিত হয়েছে। মোট ২৩৬টি অস্ত্র উদ্ধার হলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর লুট হওয়া ১,৩৩৩টি অস্ত্র এখনও উদ্ধার হয়নি।
প্রার্থীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও লক্ষ্যণীয়। গোপালগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপির প্রার্থী এস এম জিলানী কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে বৈঠকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরিধান করে শঙ্কা প্রকাশ করেন। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অন্তত ২০ জন নেতা নিজেদের নিরাপত্তার জন্য সরকারের কাছে আবেদন করেছেন।
নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নির্বাচনী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। পুলিশের ১,৮৭,৬০৩ জন কর্মী দায়িত্ব পালন করবেন। তবে নিরাপত্তার সঙ্গে জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ভোটের আগে আইনশৃঙ্খলার নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি, প্রার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ এবং নির্বাচনী পরিবেশে অস্থিতিশীলতা আরও বৃদ্ধি পাবে। ফলে, ভোট শুরুর আগেই শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করাই দেশের জন্য জরুরি।