খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটিয়ে ইসরায়েল এবং ওই অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। ইরানের বিশেষায়িত সামরিক বাহিনী ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর’ (আইআরজিসি) এই হামলার দায় স্বীকার করে জানিয়েছে যে, এটি তাদের ৩৪তম দফার একটি সুপরিকল্পিত সামরিক অভিযান। এই হামলায় সাধারণ পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি প্রথমবারের মতো অত্যাধুনিক হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের দাবি করেছে তেহরান, যা এই অঞ্চলের নিরাপত্তা সমীকরণকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা মেহর নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইআরজিসি ইসরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থানে আঘাত হেনেছে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের বিশেষত্ব হলো এটি শব্দের গতির চেয়ে অন্তত পাঁচ গুণ দ্রুত (ম্যাক-৫ বা তার বেশি) চলতে পারে এবং মাঝ আকাশে নিজের গতিপথ পরিবর্তন করতে সক্ষম, যা বর্তমান বিশ্বের অধিকাংশ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে পারে।
নিচে হামলার লক্ষ্যবস্তু ও প্রধান আক্রান্ত স্থানগুলোর একটি তালিকা দেওয়া হলো:
| লক্ষ্যবস্তুর নাম | অবস্থান | ধরন |
| আল-ধাফরা বিমান ঘাঁটি | আবুধাবি, সংযুক্ত আরব আমিরাত | মার্কিন সামরিক ঘাঁটি |
| জুফায়ের নৌ-ঘাঁটি | বাহরাইন | মার্কিন সামরিক ঘাঁটি |
| রামাত ডেভিড বিমান ঘাঁটি | উত্তর ইসরায়েল | ইসরায়েলি সামরিক অবস্থান |
| হাইফা বিমানবন্দর | হাইফা, ইসরায়েল | বেসামরিক ও কৌশলগত স্থাপনা |
| তেল আবিবের পূর্বাঞ্চল | ইসরায়েল | গোপন ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার সাইট |
আইআরজিসি-র বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, হামলায় তিন ধরনের উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। তাদের মতে, তেল আবিবের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত ইসরায়েলের গোপন ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলোতে ইরানের শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি আঘাত হেনেছে। ইরান দীর্ঘদিন ধরেই তাদের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘ফাত্তাহ’ বা এর উন্নত সংস্করণ নিয়ে কাজ করছিল। আজকের এই হামলায় সেই প্রযুক্তির ব্যবহার ওয়াশিংটন এবং তেল আবিবের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) ইরান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার সত্যতা নিশ্চিত করেছে। ইসরায়েল জুড়ে সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানো হয়েছে এবং সাধারণ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইসরায়েলি সামরিক মুখপাত্র জানিয়েছেন, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘অ্যারো’ এবং ‘ডেভিডস স্লিং’ সক্রিয় রয়েছে এবং আগত অনেক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে। তবে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের গতির কারণে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অন্যদিকে, পেন্টাগন জানিয়েছে তারা মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সেনা ও মিত্রদের রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং পরিস্থিতির ওপর গভীর নজর রাখছে।
এই হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে একটি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের আশঙ্কা তীব্রতর হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এবং ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি সংঘাত কেবল এই দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা সমগ্র বিশ্ব অর্থনীতি, বিশেষ করে জ্বালানি তেলের বাজারে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ওমান উপসাগর এবং পারস্য উপসাগরে জাহাজী চলাচলের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইতিমধ্যে উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে, তবে তেহরানের পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে যে, তাদের সার্বভৌমত্বে আঘাত এলে পাল্টা জবাব আরও কঠোর হবে।