খবরওয়ালা প্রতিবেদক
প্রকাশ: 13শে জ্যৈষ্ঠ ১৪৩২ | ২৭ই মে ২০২৫ | 1149 Dhu al-Hijjah 5
গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে দেশে উচ্ছৃঙ্খল জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। এই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘মব’ শব্দটি ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, গত ৯ মাসে মব সৃষ্টিকারীদের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৪৩ জন। আহত হয়েছেন আরও ১৩৯ জন।
‘মব’ শব্দের অর্থ উচ্ছৃঙ্খল জনতা। যখন এই জনতা নিজেদের হাতে আইন তুলে নিয়ে কাউকে শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা করে, সেটিই হয়ে ওঠে ‘মব জাস্টিস’। আইনের শাসনের বিপরীতে জনতার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াই এর কেন্দ্রবিন্দু। যদিও এই প্রবণতা অপরাধ দমনের পরিবর্তে সমাজে ভীতি, বিশৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচারের অপব্যবস্থার জন্ম দিচ্ছে।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী, গত ৯ মাসে মব ভায়োলেন্সে নিহত হয়েছেন ১৪৩ জন এবং আহত হয়েছেন ১৩৯ জন। গত দশ বছরে মোট নিহত ৭৯২ জনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে ২০২৪ সালেই। অন্তর্বর্তী সরকারের ৯ মাস পূর্ণ হলেও পুলিশ মব নির্মূলে দৃশ্যমান কোনো কঠোর আইনগত পদক্ষেপ নিতে পারেনি। তাদের পক্ষ থেকে এখনো শুধু “প্রতিরোধের প্রতিশ্রুতি” শোনা যাচ্ছে।
গত ১৯ মে রাতে রাজধানীর ধানমন্ডি ৪ নম্বর সড়কে এক প্রকাশকের বাড়িতে ঢোকার চেষ্টা করে একদল যুবক। তারা ওই ব্যক্তিকে “ফ্যাসিবাদের দোসর” আখ্যা দিয়ে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ধানমন্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ক্যশৈন্যু মারমা শান্ত ও পেশাদারভাবে পরিস্থিতি সামাল দেন। পরবর্তীতে ওই ঘটনার জন্য তাঁকে ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলীর হাতে বিশেষ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।
পুলিশ জানায়, ধানমন্ডির ওই ঘটনায় যুক্ত ছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মোহাম্মদপুর থানা শাখার আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম রাব্বি। পরদিন তাকে সংগঠনের পক্ষ থেকে নৈতিক স্খলনের দায়ে অব্যাহতি দেওয়া হয়। থানা হেফাজত থেকে সাইফুলসহ তিনজনকে মুক্ত করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদ। তারা মুচলেকা দেন, ভবিষ্যতে আর এমন কাজে যুক্ত হবেন না।
২১ মে ডিএমপি এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনা ভবিষ্যতে কোনোভাবে বরদাশত করা হবে না। যেকোনো ধরনের মব ভায়োলেন্স প্রতিরোধে পুলিশ পেশাদারিত্ব ও আইনি প্রক্রিয়ার ওপর জোর দেবে।
একই দিন পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি ইনামুল হক সাগর বলেন, “আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ নেই। যেকোনো প্রয়োজনে পুলিশকে জানান, আমরা ব্যবস্থা নেব।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের ৯ মাস পেরিয়ে গেলেও দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। বরং মব এবং ব্যক্তিগত স্বার্থে পরিচালিত হয়রানি ও মিথ্যা মামলার প্রবণতা বেড়েছে। পুলিশের মধ্যে দ্বিধা কাজ করছে।”
তিনি আরও বলেন, “মবের মাধ্যমে কাউকে অপদস্থ বা শারীরিকভাবে আঘাত করা হলে তার বিচার হওয়া উচিত। আইনের ভয় না থাকলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে, আর সাধারণ মানুষ আতঙ্কে দিন কাটায়।”
সরকারি অবস্থান স্পষ্ট করতে গিয়ে ৯ মার্চ সচিবালয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেন, “যেই হোন না কেন, ধর্ম, বর্ণ বা পরিচয় যাই হোক, মব জাস্টিস বরদাশত করা হবে না। আজ থেকে সরকার কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে।”
দেশে মব জাস্টিসের ধারাবাহিকতায় গত ৪ মার্চ ভাটারা এলাকায় ইরানের দুই নাগরিককে ছিনতাইকারী তকমা দিয়ে মারধর করা হয়। যদিও পুলিশ পরে জানায়, তারা ছিনতাইকারী নন, বরং মুদ্রা বিনিময় নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির শিকার হন।
১ মার্চ লালমাটিয়ায় ধূমপান করাকে কেন্দ্র করে দুই তরুণী জনতার হাতে লাঞ্ছনার শিকার হন। এভাবেই ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিবাদের জেরে মানুষ যেকোনো সময় মবের শিকার হয়ে উঠছেন।
মব ভায়োলেন্স এখন শুধু আইনি নয়, সামাজিক নিরাপত্তার বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগে জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার এই প্রবণতা উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। এখনই যদি মব-নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তবে আইনের শাসন শুধু দুর্বলই নয়, পুরোপুরি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।
খবরওয়ালা/এমএজেড