খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৪ জুলাই ২০২৫
প্রেম, বেদনা, সংগ্রামের ছায়াছবি এঁকে তিনি বাঙালির মনোজগতে সৃষ্টি করেছিলেন এক অনন্য স্থান। আজও তার অবিনাশী ছায়া প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সিনেমাপ্রেমীদের হৃদয়ে জ্বালিয়ে যাচ্ছে অনির্বাণ দীপশিখা। আজ বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তম কুমারের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী।
অভিনয়জীবনের শুরুটা হয়েছিল ‘ফ্লপ মাস্টার’ তকমা নিয়ে, কিন্তু অদম্য অধ্যবসায় ও বিরল প্রতিভার বলেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের একমাত্র ‘মহানায়ক’। তাঁর ক্যারিশমা, বহুমাত্রিক অভিনয়শৈলী এবং চরিত্র বিশ্লেষণের গভীরতা তাঁকে কেবল এক জন জনপ্রিয় তারকা নয়, পরিণত করেছিল এক সাংস্কৃতিক কিংবদন্তিতে। চার দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও উত্তম কুমার রয়ে গেছেন আপামর বাঙালির চেতনায় অমলিন।
অরুণ থেকে উত্তম: এক কিংবদন্তির শুরু
১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কলকাতার আহিরীটোলায় এক নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন অরুণ কুমার চ্যাটার্জি। বাবা সাতকড়ি চ্যাটার্জি ছিলেন মেট্রো সিনেমা হলে প্রজেকশনিস্ট, আর মা চপলা দেবী – সংসার সামলানো এক প্রাঞ্জল গৃহিণী। তিন ভাইবোনের মধ্যে অরুণ ছিলেন বড়, আর ছোটবেলা থেকেই তার মধ্যে শিল্পের প্রতি ছিল সহজাত আকর্ষণ।
মাত্র পাঁচ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মুকুট’ নাটকে অভিনয় করে সোনার পদক জেতেন, যা যেন ভবিষ্যতের আভাস দিয়েছিল। পড়াশোনা শেষ না করেই কলকাতা বন্দরে একটি সাধারণ চাকরি নিয়ে শুরু হয় কর্মজীবন। পরিবারের নানির দেওয়া নাম ‘উত্তম’ই পরবর্তী জীবনে হয়ে ওঠে তার চিরচেনা পরিচয়।
‘ফ্লপ মাস্টার’ থেকে ‘মহানায়ক’ — অধ্যবসায়ের এক অনন্য গাঁথা
১৯৪৮ সালে ‘দৃষ্টিদান’ ছবির মাধ্যমে তার অভিনয়জীবন শুরু হলেও মুক্তি পায়নি প্রথম অভিনীত ছবি ‘মায়াডোর’। পরবর্তী পাঁচ বছরে বক্স অফিসে একের পর এক ব্যর্থতা তাঁকে ‘ফ্লপ মাস্টার’ নামে চিহ্নিত করে। কিন্তু থেমে যাননি উত্তম। তার মেধা, নিষ্ঠা ও আত্মবিশ্বাস ছিল অটুট।
১৯৫২ সালের ‘বসু পরিবার’ সিনেমায় প্রথম সাড়া মেললেও, ১৯৫৩ সালের ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছিল সেই মোড়ঘোরানো সিনেমা, যা তাকে এনে দেয় স্থায়ী স্থান চলচ্চিত্র জগতে। এই সিনেমার মাধ্যমেই সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তার কিংবদন্তি জুটি গড়ে ওঠে, যা পরবর্তী দশকে বাংলা সিনেমার শ্রেষ্ঠ রসায়নের প্রতীক হয়ে ওঠে।
ভারত সরকার ১৯৭৫ সালে তাঁকে ‘মহানায়ক’ উপাধিতে ভূষিত করে – যা সংসদে ঘোষিত হয়েছিল। তার অভিনয় শুধু রোমান্টিক চরিত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি সমান দক্ষতায় অভিনয় করেছেন কমেডি, ট্র্যাজেডি, গোয়েন্দা ও খলচরিত্রেও। সত্যজিৎ রায়ের ‘চিড়িয়াখানা’-তে ব্যোমকেশ বক্সী কিংবা ‘অমানুষ’-এর রাজাসাহেব – প্রত্যেকটি চরিত্রে তিনি ছিলেন অনবদ্য।
পরিসমাপ্তি এক জীবন্ত কিংবদন্তির
মাত্র ৫৩ বছর বয়সে ১৯৮০ সালের এই দিনে, ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ ছবির শ্যুটিং চলাকালীন অসুস্থ হয়ে পড়েন উত্তম কুমার। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রয়াত হন তিনি।
আজ, তার চলে যাওয়ার ৪৪ বছর পরেও উত্তম কুমার কেবল একটি নাম নয়, এক আবেগ, এক ঐতিহ্য। তিনি বেঁচে আছেন পর্দায়, প্রতিটি সংলাপে, প্রতিটি অভিব্যক্তিতে – যেখানে প্রেম, বেদনা আর সংগ্রাম বাঙালির জীবনের রূপক হয়ে উঠেছে তার শিল্পের ছোঁয়ায়।
মহানায়ক শুধু ছিলেন না, আজও আছেন – বাংলা চলচ্চিত্রের চিরন্তন নক্ষত্র হয়ে।