মোঃ ফারুক আহম্মেদ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬
সমস্যা উৎপাদনে নয়—বাজার, বণ্টন ও ক্ষমতার অসমতায়
ভোরের কুয়াশা কাটতেই বগুড়ার এক কৃষক দাঁড়িয়ে থাকেন তার সোনালি ধানের পাশে। ফলন ভালো—পরিশ্রম সফল। তবুও তার চোখে দুশ্চিন্তা। কারণ তিনি জানেন, ধান ফলানোই শেষ কথা নয়; আসল লড়াই শুরু হয় বাজারে।
তার প্রশ্ন সহজ—“ধান তো ফলাই, কিন্তু লাভটা যায় কোথায়?”
উৎপাদনে সাফল্য, আয়ে স্থবিরতা
বাংলাদেশ আজ বিশ্বে ধান উৎপাদনে শীর্ষ দেশগুলোর একটি। বছরে প্রায় ৩.৫–৪ কোটি টন ধান উৎপাদিত হয়—যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি।
কিন্তু এই সাফল্যের প্রতিফলন কৃষকের আয়-ব্যয়ে তেমন দেখা যায় না।
সমস্যা তাই উৎপাদনে নয়—
👉 সমস্যা বাজার কাঠামোতে
👉 সমস্যা মূল্য নির্ধারণে
👉 সমস্যা আর্থিক প্রবাহে
উৎপাদন বনাম বাজার: কোথায় বিচ্ছিন্নতা?
উৎপাদিত ধানের পুরোটা বাজারে আসে না।
নিজস্ব ভোগ
বীজ সংরক্ষণ
অপচয়
এসব বাদ দিলে মোট উৎপাদনের ৫০–৬০% বাজারে প্রবেশ করে—এটাই কৃষকের আয়ের মূল উৎস।
কিন্তু বাজারে ঢোকার পরই কৃষকের নিয়ন্ত্রণ প্রায় শেষ।
ধানের যাত্রাপথ দীর্ঘ—
কৃষক → ফড়িয়া → আড়তদার → মিলার → পাইকার → খুচরা বিক্রেতা
প্রতিটি স্তরে মূল্য বাড়ে, কিন্তু
✔ সবচেয়ে কম অংশ পান কৃষক
✔ সবচেয়ে বেশি মূল্য দেন ভোক্তা
এই ব্যবধানই বাজারের সবচেয়ে বড় অসাম্য।
তথ্যের অভাব, দরকষাকষির দুর্বলতা
কৃষক সময়মতো বাজারদরের তথ্য পান না।
দাম নির্ধারণেও তার কার্যকর ভূমিকা নেই।
ফলে তিনি হয়ে পড়েন—
👉 মূল্যগ্রহীতা (price taker), মূল্য নির্ধারক নন।
মৌসুমি দাম ও “Distress Selling”
ধান বাজারের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা—মৌসুমি দামের পতন।
ফসল কাটার সময় → সরবরাহ বেশি → দাম কম
কিছুদিন পর → সরবরাহ কম → দাম বাড়ে
কিন্তু ততদিনে কৃষকের ঘরে ধান থাকে না।
বর্তমান চিত্র (গড় হিসেবে):
বাজারদর: ১,১০০–১,২৫০ টাকা/মণ
সরকারি মূল্য: ১,৩০০–১,৩৫০ টাকা/মণ
👉 প্রতি মণে ১০০–২০০ টাকার ক্ষতি
👉 ১০০ মণে ক্ষতি: ১০–১২ হাজার টাকা
এই বাধ্যতামূলক কম দামে বিক্রিই “distress selling”—যা কৃষকের আয়ের বড় শত্রু।
আর্থিক বৈষম্য: অদৃশ্য সংকট
সমস্যা শুধু বাজারে নয়—অর্থনীতির গভীরেও।
তথ্য বলছে:
ব্যাংক আমানতের ৮৪% শহরে, গ্রামে মাত্র ১৬%
ঋণের ৯২% শহরে, গ্রামে মাত্র ৭–৮%
ফলাফল:
✔ কৃষক সহজে ঋণ পান না
✔ জরুরি প্রয়োজনে (চিকিৎসা, শিক্ষা) নগদ দরকার হলে
👉 কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হন
এতে তার দরকষাকষির ক্ষমতা আরও কমে যায়।
সরকারি উদ্যোগ: e-Procurement
সরকার বছরে প্রায় ১৫–২০ লাখ টন ধান ও চাল সংগ্রহ করে—যা মোট উৎপাদনের মাত্র ৪–৬%।
এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে চালু হয়েছে
👉 Krishoker App ভিত্তিক e-Procurement (২০১৯)
উদ্দেশ্য:
কৃষকের সরাসরি অংশগ্রহণ
মধ্যস্বত্বভোগী কমানো
General Economics Division-এর গবেষণা বলছে:
কৃষকের আয় বেড়েছে ২৪–৩২%
পারিবারিক আয় বেড়েছে ১০–১৮%
👉 অর্থাৎ, সরাসরি বাজারে প্রবেশাধিকারই আয় বৃদ্ধির চাবিকাঠি।
কেন প্রভাব এখনও সীমিত?
বাস্তবতা এখনও অসম্পূর্ণ:
মাত্র ৩০–৪০% কৃষক অংশ নিতে পারেন
লটারিভিত্তিক নির্বাচন
সংগ্রহ কেন্দ্র দূরে
ডিজিটাল দক্ষতার অভাব
সময়মতো ক্রয় শুরু না হওয়া
ফলে একই গ্রামে—
একজন কৃষক লাভবান, অন্যজন বঞ্চিত।
মূল সংকট: তিন স্তরের সমস্যা
সব তথ্য মিলিয়ে সংকট স্পষ্ট—
১. আর্থিক বৈষম্য
ঋণ ও বিনিয়োগ শহরকেন্দ্রিক
২. বাজার কাঠামো
কৃষকের ভূমিকা দুর্বল
৩. নীতির বাস্তবায়ন
উদ্যোগ আছে, বিস্তৃতি সীমিত
করণীয়: কী বদলাতে হবে?
সমাধান অসম্ভব নয়—প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন:
✔ ফসল কাটার শুরুতেই সরকারি ক্রয়
✔ গ্রামে আধুনিক সংরক্ষণ (storage) ব্যবস্থা
✔ সহজ কৃষিঋণ ও গ্রামীণ ব্যাংকিং সম্প্রসারণ
✔ মোবাইল/ডিজিটাল মাধ্যমে বাজারদর তথ্য
✔ e-Procurement সর্বজনীন করা
✔ স্থানীয় পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও তদারকি
শেষ কথা: উন্নয়ন কাকে বলে?
Bangladesh Institute of Development Studies-এর গবেষণা বলছে—
ধান উৎপাদনে কৃষকের প্রকৃত লাভ অনেক সময় এতটাই কম যে নিজের শ্রমের মূল্য ধরলে তা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি।
ধান শুধু একটি ফসল নয়—
এটি খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং কোটি মানুষের জীবন।
আমাদের খাদ্যতালিকা এখনো ভাতনির্ভর—
তাই কৃষকের ন্যায্যতা মানেই দেশের স্থিতি।
সেই দিনই প্রকৃত উন্নয়ন হবে—
যেদিন একজন কৃষক নিশ্চিন্তে বলতে পারবেন:
“আমি আমার ধানের ন্যায্য দাম পেয়েছি।”
সাবেক ব্যাঙ্কার