খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
মানবাধিকার ও বিশ্ব নিরাপত্তার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে এক উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটির প্রকাশিত ২০২৬ সালের বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা এবং চীন ও রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠিত নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ৫২৯ পৃষ্ঠার এই ৩৬তম সংস্করণে বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বলা হয়েছে, বর্তমান প্রজন্ম এখন এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের নির্বাহী পরিচালক ফিলিপ্পে বোলোপিওঁ প্রতিবেদনটির ভূমিকায় লিখেছেন যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে মার্কিন সরকার বর্তমানে আইনের শাসনের ওপর ধারাবাহিক আক্রমণ চালাচ্ছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে সরে আসার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার সুরক্ষার কাঠামোকে দুর্বল করে দিচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের দীর্ঘদিনের স্বীকৃত মানদণ্ডগুলোকে অগ্রাহ্য করছে, যা মূলত চীন ও রাশিয়ার মতো শক্তিগুলোর নিয়ম ভঙ্গকারী উচ্চাকাঙ্ক্ষাকেই ত্বরান্বিত করছে।
প্রতিবেদনে ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেওয়া বিভিন্ন বিতর্কিত পদক্ষেপের একটি তালিকা তুলে ধরা হয়েছে। নিচে ট্রাম্পের নীতি ও তার প্রভাবের একটি সংক্ষিপ্ত সারণি দেওয়া হলো:
| ক্ষতিগ্রস্ত খাত | ট্রাম্প প্রশাসনের গৃহীত পদক্ষেপ ও প্রভাব |
| বিচার বিভাগ | বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ এবং আদালতের আদেশ অমান্য। |
| নাগরিক অধিকার | নারী অধিকার খর্ব, গর্ভপাত সেবায় বাধা এবং ট্রান্স ও ইন্টারসেক্স সুরক্ষা প্রত্যাহার। |
| আন্তর্জাতিক সংস্থা | জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ ও প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার। |
| বৈদেশিক সহায়তা | জীবনরক্ষাকারী মানবিক সহায়তা ও স্বাস্থ্যসেবা ভর্তুকি প্রায় পুরোপুরি বন্ধ। |
| গণমাধ্যম ও সমাজ | গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং এমনকি কৌতুকশিল্পীদেরও ভয়ভীতি প্রদর্শন। |
| আঞ্চলিক নিরাপত্তা | ইসরায়েলকে নিঃশর্ত সমর্থন এবং ইউক্রেনকে ভূখণ্ড ছাড়তে চাপ প্রদান। |
এইচআরডব্লিউ-এর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার বিমুখতার কারণে বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সুদানের দারফুরে পুনরায় জাতিগত নিধন চললেও ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর প্রতিরোধ নেই। একইভাবে, অধিকৃত ফিলিস্তিনি অঞ্চলে ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানে ৭১ হাজারেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি এবং ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটলেও ওয়াশিংটন শর্তহীন সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেন সংকটের ক্ষেত্রেও ট্রাম্পের অবস্থান রাশিয়ার গুরুতর যুদ্ধাপরাধের দায়কে লঘু করে দেখাচ্ছে এবং পুতিনের ওপর চাপ প্রয়োগের পরিবর্তে জেলেনস্কিকে ভূখণ্ড ছাড়ার প্রস্তাব দিয়ে বৈশ্বিক নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় এইচআরডব্লিউ গণতান্ত্রিক দেশগুলোকে একটি ‘কৌশলগত জোট’ গঠনের পরামর্শ দিয়েছে। বোলোপিওঁ বলেন, শুধুমাত্র সুপারপাওয়ারদের ওপর নির্ভর না করে মানবাধিকারকামী সরকার, নাগরিক সমাজ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে একত্রে কাজ করতে হবে। এই জোট জাতিসংঘে একটি শক্তিশালী ভোটদানকারী ব্লক হিসেবে কাজ করতে পারে, যা সুপারপাওয়ারদের বিরোধিতা সত্ত্বেও গণতান্ত্রিক মানদণ্ডগুলোকে টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হবে। ২০২৬ সাল বিশ্ব রাজনীতির জন্য একটি অগ্নিপরীক্ষা হতে যাচ্ছে, যেখানে সমন্বিত প্রতিরোধই হতে পারে স্বাধীনতার একমাত্র রক্ষা কবজ।