খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৬ মে ২০২৬
মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার তরা এলাকায় মাছ চুরির অভিযোগে আটক এক যুবকের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। নিহতের নাম কৃষ্ণ রাজবংশী। বুধবার (৬ মে, ২০২৬) সকাল থেকে দুপুরের মধ্যবর্তী সময়ে উপজেলার তরা বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির কার্যালয়ে এই ঘটনা ঘটে। অভিযোগ উঠেছে যে, ওই যুবককে গণপিটুনি দেওয়ার পর কার্যালয়ে আটকে রাখা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে তাকে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। বাজার কমিটি একে আত্মহত্যা বলে দাবি করলেও স্থানীয় বাসিন্দারা বিষয়টিকে রহস্যজনক বলে অভিহিত করেছেন।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, বুধবার সকালে তরা মাছের আড়ত থেকে মাছ চুরির অভিযোগে কৃষ্ণ রাজবংশী ও আরও একজনকে আটক করেন তরা বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য ও স্থানীয় লোকজন। আটককৃত কৃষ্ণ রাজবংশী মানিকগঞ্জ পৌরসভার বান্দুটিয়া মাঝিপাড়া এলাকার খুদিরাম রাজবংশীর পালক পুত্র ছিলেন। আটকের পরপরই তাদের ওপর উত্তেজিত জনতার একাংশ চড়াও হয় এবং গণপিটুনি প্রদান করে বলে প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে। পরবর্তীতে আটক দুইজনের মধ্যে একজনকে কারো জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হলেও কৃষ্ণ রাজবংশীকে ছাড়া হয়নি। তাকে বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির কার্যালয়ের একটি কক্ষে দীর্ঘক্ষণ তালাবদ্ধ করে রাখা হয়।
বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির দাবি অনুযায়ী, বুধবার সকাল থেকে দুপুরের মধ্যে কোনো এক সময় কৃষ্ণ রাজবংশী কার্যালয়ের ভেতরে সিলিং ফ্যানের সাথে গামছা পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন। তবে স্থানীয়দের মধ্যে এই মৃত্যুর কারণ নিয়ে গভীর সন্দেহ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী রেদওয়ান মামুন গণমাধ্যমকে জানান, কৃষ্ণকে আটক করে প্রচণ্ড মারধর করার পর অফিসে আটকে রাখা হয়েছিল। পরে তাকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখা গেলে কমিটির কয়েকজন সদস্য তড়িঘড়ি করে মরদেহটি কার্যালয় থেকে বের করে হাসপাতালে নেওয়ার অজুহাতে সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করেন। স্থানীয় বাসিন্দারা ঘটনাটি টের পেয়ে মরদেহ সরাতে বাধা দিলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ঘটনাস্থল থেকে সটকে পড়েন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, যদি এটি স্বাভাবিক আত্মহত্যাই হতো, তবে পুলিশ আসার আগেই মরদেহ সরানোর এমন তৎপরতা চালানো হতো না। এছাড়া মরদেহের গায়ে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ঘটনার খবর পেয়ে মানিকগঞ্জ সদর থানা পুলিশের একটি বিশেষ দল দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এলাকায় পুলিশি নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। পুলিশ তরা বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির কার্যালয় থেকে কৃষ্ণ রাজবংশীর মরদেহ উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেছে। প্রাথমিক প্রক্রিয়া শেষে মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য মানিকগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।
মানিকগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইকরাম হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান:
“তরা বাজার এলাকায় চুরির অভিযোগে আটক একজনের মৃত্যুর খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠিয়েছি। মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হচ্ছে। এটি আত্মহত্যা নাকি অন্য কোনো কারণে মৃত্যু হয়েছে, তা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। তদন্ত সাপেক্ষে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
কৃষ্ণ রাজবংশীর মৃত্যুর সংবাদ তার এলাকায় পৌঁছালে বান্দুটিয়া মাঝিপাড়া এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। তার পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, কৃষ্ণকে অন্যায়ভাবে পিটিয়ে হত্যা করে আত্মহত্যার নাটক সাজানো হচ্ছে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্যমতে, মাছ চুরির মতো অপরাধে কাউকে এভাবে পিটিয়ে বা আটকে রেখে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। তারা এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার দাবি করেছেন।
অন্যদিকে, তরা বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক লিখিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ঘটনার পর থেকে কমিটির সাথে যুক্ত অনেককেই এলাকায় দেখা যাচ্ছে না বলে স্থানীয় সূত্রে খবর পাওয়া গেছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং পুলিশের তদন্তই এখন নির্ধারণ করবে যে, এটি সত্যিই আত্মহনন নাকি গণপিটুনি পরবর্তী কোনো হত্যাকাণ্ড।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে সন্দেহ করা হলেও তাকে নিজের হেফাজতে নিয়ে বিচারবহির্ভূতভাবে মারধর করা বা দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, গণপিটুনি বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সরাসরি ফৌজদারি মামলা দায়ের করার বিধান রয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে যদি আঘাতের কারণে মৃত্যুর প্রমাণ পাওয়া যায় বা আত্মহত্যার প্ররোচনার কোনো দিক উঠে আসে, তবে বাজার কমিটির সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
বর্তমানে এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং পুলিশ বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে শান্ত থাকার এবং আইনের প্রতি আস্থাশীল হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে থানা সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে