নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: শনিবার, ১৯ জুলাই ২০২৫
প্রাত্যহিক জীবনে আমরা পুষ্টিকর পানীয় হিসেবে দুধের ব্যবহার দেখে অভ্যস্ত। কিন্তু কখনও কখনও দেখা যায় মানুষ দুধ দিয়ে গোসল করছে। তখন এটি আমাদের কাছে সংবাদ হয়ে আসে।
কেউ জেল থেকে মুক্তি পেয়ে দুধ দিয়ে গোসল করে, কেউ আবার বউ তালাকের পর দুধ দিয়ে গোসল করে। মানসিক যন্ত্রণা, অশান্তি থেকে মুক্তি পেয়েও কেউ কেউ দুধ দিয়ে গোসল করে। এরকম নানা ধরণের সংবাদ আমরা প্রায়শই দেখি।
সনাতনধর্মীদের মধ্যে দেখা যায় কখনও মন্দিরে দেবতাকে দুধ ঢালছে, কখনও কোনো জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বের মূর্তিতে দুধ ঢালা হচ্ছে, আবার কখনও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে কেউ নিজের শরীরে দুধ ঢালছেন। কিন্তু মানুষ কেন দুধ দিয়ে গোসল করে? এর ঐতিহাসিক ভিত্তিইবা কি? এর সুফলটা আসলে কোথায়?
ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষরা মূলত বিশ্বাস থেকেই দুধকে পবিত্র উপাদান হিসেবে গণ্য করে। বৈদিক যুগ থেকেই গরুর দুধ, ঘি, দই ইত্যাদি নানা আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহার হতো। ব্রাহ্মণদের শুদ্ধ করার জন্য দুধে স্নান করানোর রীতি ছিল। দেবতাদের মূর্তিতে ‘অভিষেক’ করতে দুধ ঢালা হতো।
হিন্দু ধর্মের মন্দির চর্চায় ‘অভিষেক’ একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় রীতি। এটি হলো কোনো দেবমূর্তি বা প্রতীককে পবিত্র তরল (দুধ, পানি, ঘি, মধু ইত্যাদি) দিয়ে স্নান করানো।
বিশেষ করে শিবলিঙ্গে দুধ ঢালা হিন্দু ভক্তদের অন্যতম সাধারণ ও ঐতিহ্যবাহী রীতি। ধারণা করা হয়, এতে দেবতা প্রসন্ন হন এবং পুণ্যলাভ হয়। দুধের মধ্যে রয়েছে ‘সত্ব’ গুণ, যা শুদ্ধতা ও নির্মলতার প্রতীক।
দুধ দিয়ে স্নান করানো হয়: জন্মাষ্টমী, মহাশিবরাত্রি, রথযাত্রা ইত্যাদি পূজায়, উপনয়ন, বিবাহ বা রাজ্যাভিষেকের মতো গুরুত্বপূর্ণ আচার-অনুষ্ঠানে, পাপমোচনের প্রতীক হিসেবে
প্রাচীন ভারতে কোনো রাজা বা রাজপুত্র যখন সিংহাসনে বসতেন, তখন ‘রাজ্যাভিষেক’-এর সময় দুধ দিয়ে স্নান করানো হতো। এটি ছিল ‘শুভ্রতা’, ‘ঐশ্বরিকতা’ ও ‘দেবত্ব’ আরোপের প্রতীক। জনগণের সামনে তাঁকে যেন ‘দেব-মানব’ বা পবিত্র শাসক হিসেবে তুলে ধরা যায়—এই ছিল মূল উদ্দেশ্য।
কথিত আছে, প্রাচীন মিসরের রানি ক্লিওপেট্রা প্রতিদিন গাধার দুধ দিয়ে গোসল করতেন। তার বিশ্বাস ছিল, এতে ত্বক কোমল ও তারুণ্যদীপ্ত থাকে। এই দুধস্নান ছিল সে সময়ের রাণীদের মধ্যে সৌন্দর্য রক্ষার প্রতীক।
রোমান অভিজাত শ্রেণি দুধ, মধু, গোলাপজল দিয়ে তৈরি স্নানজলে সময় কাটাতেন। এটি ছিল বিলাসিতা ও আরামপ্রিয় জীবনের প্রতীক।
এই আধুনিক যুগে এসেও আমরা দুধ দিয়ে গোসল বা ঢালার রীতি দেখি, তবে তা মূলত প্রতীকী।
দক্ষিণ ভারতে জনপ্রিয় অভিনেতা বা রাজনৈতিক নেতার পোস্টারে দুধ ঢালা হয়। এটি ‘ভক্তি’ এবং ‘নায়ককে দেবতার মর্যাদা’ দেওয়ার একধরনের সংস্কৃতি।
বিশেষ ব্রত, মানত বা রোগমুক্তির উদ্দেশ্যে অনেকেই দুধ ঢেলে স্নান করেন — এটি তারা করেন আত্মশুদ্ধি বা ঈশ্বরের কৃপা পাওয়ার আশায়।
তবে এই প্রথার সমালোচনাও রয়েছে, বিশেষ করে যেখানে দুধ অপচয় হয় অথচ দরিদ্র শিশু দুধ না পেয়ে অপুষ্টিতে ভোগে।
যদিও এই রীতিগুলো ধর্মীয় ঐতিহ্যের অংশ, তথাপি আধুনিক যুগে প্রশ্ন উঠেছে: দুধের মতো পুষ্টিকর খাদ্য বিলাসিতায় ব্যবহার কতটা ন্যায্য?
তবে দুধ মিশ্রিত পানিতে গোসলের বেশ কিছু স্বাস্থ্যগত উপকারিতা আছে। প্রাচীন রোমানরা মুখের ত্বক কোমল রাখতে নিয়মিত দুধ মিশ্রিত পানিতে গোসল করতেন। ফারাও ক্লিওপেট্রা দুধ এবং মধু মিশ্রিত গরম পানিতে গোসল করে তার অপরূপ সৌন্দর্য ধরে রেখেছিলেন। চলতি শতাব্দীর শুরুতে আমেরিকায় ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল বাটারমিল্কে মুখ ধোয়া।
কেবল সৌন্দর্য বৃদ্ধি নয়, একজিমা, সোরিয়াসিস এবং শুস্কতাসহ ত্বকের বেশ কয়েকটি রোগের জন্য দুধ মিশ্রিত পানি উপকারী বলে ধরা হয়। তবে দুধ দিয়ে গোসল সবার জন্য উপকারী নাও হতে পারে, বিশেষ করে স্পর্শকাতর ত্বকের অধিকারীরা ভুগতে পারেন অ্যালার্জিতে। তাই দুধ গোসলের আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত-এমনটাই বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
খবরওয়ালা/এমএজেড