খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৬ মে ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নিরসনে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে উত্থাপিত একটি সমঝোতা প্রস্তাবকে ‘মার্কিনীদের আকাঙ্ক্ষার তালিকা’ হিসেবে অভিহিত করে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন ইরানের প্রভাবশালী সংসদ সদস্য (এমপি) ইব্রাহিম রেজাই। বুধবার (৬ মে, ২০২৬) মার্কিন সংবাদমাধ্যম এক্সিওস এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে এই কূটনৈতিক উত্তেজনার বিষয়টি সামনে এসেছে। ইব্রাহিম রেজাই স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, ওয়াশিংটন সামরিক শক্তির মাধ্যমে যা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে, আলোচনার টেবিলে বসে তা আদায় করার সুযোগ পাবে না।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম এক্সিওস বুধবার এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি দীর্ঘমেয়াদী সমঝোতা স্মারকে পৌঁছানোর লক্ষ্যে কাজ করছে। এই প্রস্তাবিত পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো বর্তমান যুদ্ধের অবসান ঘটানো। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এই প্রক্রিয়ার শুরুতে একটি ৩০ দিনের অন্তর্বর্তীকালীন সময় বা ‘গ্রেস পিরিয়ড’ শুরু হবে। এই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়ে উভয় পক্ষ বিস্তারিত আলোচনায় বসবে। প্রস্তাবের প্রধান বিষয়গুলো ছিল নিম্নরূপ:
পারমাণবিক কার্যক্রম: ইরানের চলমান পারমাণবিক কর্মসূচির সীমা নির্ধারণ এবং আন্তর্জাতিক তদারকি নিশ্চিত করা।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: ইরানের ওপর আরোপিত বিভিন্ন মার্কিন অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা।
জব্দ করা অর্থ ফেরত: আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ইরানের জব্দকৃত বিপুল পরিমাণ অর্থ অবমুক্ত করা।
হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা: বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং তা উন্মুক্ত রাখা।
যুক্তরাষ্ট্রের এই কূটনৈতিক প্রস্তাবের খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই ইরানের সংসদীয় নীতি-নির্ধারক ইব্রাহিম রেজাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তিনি মার্কিন সংবাদমাধ্যমের এই প্রতিবেদনকে বাস্তবতাবিবর্জিত বলে দাবি করেন। রেজাই তার বার্তায় উল্লেখ করেন:
“এক্সিওসের খবরে যে বার্তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তা বাস্তবতার চেয়ে মার্কিনিদের আকাঙ্খার তালিকা হিসেবেই বেশি প্রতীয়মান। মার্কিনিরা পরাজিত হতে যাওয়া এই যুদ্ধ থেকে এমন কিছুই পাবে না, যা তারা ইতিপূর্বে মুখোমুখি আলোচনার টেবিলে অর্জন করতে পারেনি।”
রেজাইয়ের এই মন্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট যে, ইরান এই প্রস্তাবকে একটি সম্মানজনক সমঝোতা হিসেবে না দেখে বরং একে ওয়াশিংটনের একপাক্ষিক শর্ত আরোপের চেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করছে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র রণক্ষেত্রে পরাজয় এড়াতে আলোচনার মাধ্যমে সুবিধা আদায়ের কৌশল গ্রহণ করেছে।
ইরানের আধা-সরকারি বার্তাসংস্থা তাসনিম নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন এই প্রস্তাবের বিষয়ে ইরান সরকার এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বা দাপ্তরিক প্রতিক্রিয়া প্রদান করেনি। তবে তেহরানের নীতিনির্ধারণী মহলে এই প্রস্তাব নিয়ে যে গভীর অসন্তোষ রয়েছে, তার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বক্তব্যে।
তাসনিম নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওই ইরানি কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত বেশ কিছু শর্ত ইরানের জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার পরিপন্থী, যা তেহরানের কাছে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। তিনি বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটনকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন:
“ইরানের বিরুদ্ধে হুমকির ভাষা ব্যবহার করা সম্পূর্ণ অকার্যকর একটি প্রক্রিয়া। যুক্তরাষ্ট্র যদি এখনও হুমকি-ধামকির মাধ্যমে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চায়, তবে বর্তমান পরিস্থিতি তাদের জন্য আরও ভয়াবহ ও জটিল হয়ে উঠতে পারে।”
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ও সামরিক স্নায়ুযুদ্ধ বর্তমানে এক সংকটময় মুহূর্তে অবস্থান করছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র চাইছে আলোচনার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা প্রশমন করতে, অন্যদিকে ইরান চাইছে তাদের ওপর থেকে সকল অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা নিঃশর্তভাবে প্রত্যাহার করা হোক। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির মতো কৌশলগত অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ এবং পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে উভয় দেশের অনমনীয় অবস্থান কোনো টেকসই সমাধানে পৌঁছানোর পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্রমতে, রয়টার্স এবং তাসনিম নিউজ উভয় সংস্থাই এই পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে। ইরান সরকারের নীরবতা এবং সংসদ সদস্যদের সরাসরি প্রত্যাখ্যানের ফলে এটি প্রতীয়মান হচ্ছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি স্থাপনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত এই পথটি তেহরানের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে না। হুমকি এবং আলোচনার এই দ্বিমুখী নীতির কারণে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে উত্তেজনার পারদ আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। তেহরান এখন পর্যন্ত তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না জানালেও ইব্রাহিম রেজাইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অবস্থান ইরানের অভ্যন্তরীণ মনোভাবের একটি জোরালো প্রতিফলন হিসেবেই দেখা হচ্ছে।