জি এম কিবরিয়া
প্রকাশ: 30শে ফাল্গুন ১৪৩২ | ১৪ই মার্চ ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
একদা সুজনের কাছে বাবাই ছিল সেরা। একেবারে উত্তম। তার মেন্টর (পরামর্শদাতা)। সুজনের কি কৌতুহল! “আমার বাবা সব জানে!”
অতঃপর নবম দশম শ্রেণির ইংরেজি-গণিত, বিজ্ঞান-ভূগোলে বাবার আমতা আমতা ভাব ক্রমে প্রকাশ পেতে থাকে, যা সুজনকে দ্বিধায় ফেলে! যদিও বাবাকে সে ভালবাসে; তবুও কলেজের তরুণ শিক্ষকটির কথা যাদুমন্ত্রের মতো লাগে। তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন ভর্তি হলো, প্রবীণ প্রফেসরকে দেখে সে একেবারেই মুগ্ধ। সুজন ভাবে, একজন মানুষ কিভাবে এতকিছু জান? সে মনে মনে ভাবে, ইস! যদি মাধ্যমিকে যদি এই প্রফেসর স্যারের মতো কাউকে পেতাম? তবে যে জীবনের অর্জন ঢের বেশি হতো! কি মিস হয়েছে মাধ্যমিকে!
মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে সুজনের, “প্রফেসর স্যার কিভাবে সব প্রশ্নের উত্তর জানে!”
এভাবেই সুজন নিজের অজান্তেই নিজ বাবা থেকে প্রফেসরে ধাবিত হয়ে যায়। এখন সুজনের কথা বলা, চিন্তা ভাবনা, দৃষ্টিভঙ্গি সবকিছুই যেন দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। সে এখন যে কোন বিষয়ে গোয়ারের মতো তর্ক করে না, কথা কম বলে। তবে যতটুকু বলে তা আগের ৫০০ শব্দের সমান ৫০ টি শব্দে সুন্দর ও সাবলীল প্রকাশ ঘটে। রাগ করে খুবই কম। সর্বদা হাসি-খুশি। প্রচুর বই পড়ে, বই প্রেমি বন্ধুদের সাথে সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি, ধর্মতত্ব, ইতিহাস ও বিজ্ঞান ও দর্শন বিষয়ে পূর্ব নির্ধারিত টপিক ভিত্তিক আলোচনা করে। এভাবেই সুজন ক্যাম্পাসের সকলের সুজন বন্ধু হয়ে উঠে। কারণ তার মেন্টর প্রফেসর এস কে সাহা, প্রফেসর জে আলী ও প্রফেসর হামিদের মতো প্রতীতযশা সমাজ বিজ্ঞানী, চিন্তাবিদ ও দার্শনিক।
ক্যাম্পাসেতো সবসময়ই থাকা যায় না। সুজনও এখন কর্মক্ষেত্রে কর্মব্যস্ত।
কিন্তু কর্মক্ষেত্র?
সুজন অনুধাবন করলো, এখানেও তার মেন্টর প্রয়োজন। কিন্তু এখানের মেন্টর একটু ভিন্ন প্রকৃতির। সুজন খোঁজের মধ্যে রয়েছে। এখানেই মেন্টর পাওয়া একটু কঠিন। তিনি হলেন বস! সব বস কি মেন্টর? সুজন জানতো, এখানে মেন্টর সহজে ধরা দিবে না, খুঁজে পেলেও তিনি প্রফেসরের মতো নরম বা দয়ালো নাও হতে পারেন। অবশেষে রবিণ স্যারকে পেলেন মেন্টর হিসেবে যিনি যাপিত জীবনের মাধ্যমে তুলতুলে সুজনকে খাঁটি সোনা করে তুলবেন!
সুজন তার পিতার তুলুতুলু আদর আর শিক্ষকের মমতা খুঁজতে গিয়ে বস রবিণ স্যারের কাছে যেন ধাক্কা খেলো।
না। তিনি এরূপ নন। তিনি সুজনকে ভালবাসেন কিন্তু আচরণে যেন প্রকাশ না ঘটে সেদিকে সচেতন। তিনি তাঁর প্রয়োজনে সুজনকে তৈরি করে নিচ্ছেন। যেমন কামার লোহা গলিয়ে পেরেক বানান, যে পেরেকটি বেঁকে যায় বা জুতসই না হয় তা যেমন ভাঙ্গারী গ্রেডে ফেলে দেন, তেমনি সুজকেও সাইড করে ফেলতে তিনি কোন দ্বিধা করবেন না; তবুও সুজন দাঁতে দাঁত চেপে বসের আদেশ নিষেধ মেনে, আগুনে পুড়ে খাঁটি সোনা হতে অপেক্ষা করে।
সুজনের অন্য কলিগগণ মনের দুঃখে বসের চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করে! কেউবা চাকরির গোষ্ঠী কিলাইয়ে [দেশের ৯০% তরুণ যা করে]; কেউবা ধাম্ভিক ও মিথ্যা অহংকারে অস্থির হয়ে দিকবিদিক ছুটে; আবার কেউবা অফিসের নোংরা পলিটিক্স জড়িয়ে বস বা অন্য কলিগদের চৌদ্দ গোষ্ঠি উদ্ধারে ব্যস্ত। আবার কেউ টাকার নেশায় মোহগ্রস্থ হয়ে দুর্নীতিতে জড়িয়ে অনেক অর্থবিত্তের মালিক হতে তৎপর; কিন্তু সুজন ধৈর্য্য ও তপস্যার মাধ্যমে অফিসের কাজকে নিজের কাজ মনে করে। সে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জিত জ্ঞানকে বাস্তবে প্রয়োগের আনন্দে কিংবা নতুন নতুন আইডিয়া কিভাবে বাস্তবায়ন করলে কোম্পানী তথা দেশের কিভাবে কল্যাণ হবে সেই প্রচেষ্টায় নিবেদিত। কারোর প্রতি সুজনের অভিযোগ নেই। বেতন কম বেশি সেদিকে খেয়াল নেই। সে নতুন কিছু শিখছে ও বাস্তবে প্রয়োগের নেশায় মত্ত। এভাবে একদিন নিজেই সুজনের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এখন তার অনুপস্থিতিতে পুরো অফিস সামলে নিতে শিখেছে। বস অসুস্থতার ছলে ফরেন ডিলিং বা ডেলিগেট ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সুজনকে দেয়। এভাবেই বস সুজনকে তৈরি করে একটি সৎ ও দক্ষ ব্যবস্থাপক হিসেবে। সুজনের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। বর্তমানের চারগুণ বেশি বেতন ও সুবিধা দিয়ে সুজনকে পেতে চায় আরেকটি গ্রুপ অব কোম্পানী। এখানেও সুজন ঐ বস তথা মেন্টরের পরামর্শ নেয়। বস সুজনকে দোয়াসহ হাসি মুখে বিদায় দেয়।
সুজন আবার খুঁজতে থাকে তার নতুন মেন্টর।
মনে রাখতে হবে, জীবন তোমার জন্য অপেক্ষা করবে না। কিংবা তোমাকে পুনঃরায় সুযোগ দেবে না।
যখন দেখবে তোমার মেধা কোন কাজে লাগল না; তোমার শ্রম পণ্ড হয়েছে; তুমি হতাশাগ্রস্ত হবে, আফসোস করবে কিংবা হিংসা করবে তোমার বন্ধুটিকে। অর্থাৎ সুজন কিভাবে সফল হলো?
এখন তুমি আত্ম সমালোচনায় মগ্ন। কেন তুমি পরাজিত হলে? তোমার কি কি সমস্যা ছিল? নিশ্চয়ই অনুধাবন করেছো।
এখানে তোমার মূল সমস্যা ছিলো, তোমার যথার্থ কোন মেন্টর ছিল না। যিনি তোমাকে জীবনমুখি করতে পারতেন। এখন তোমার আফসোস করা ছাড়া আর কি থাকতে পারে?
তোমার মেন্টর কি তোমার কাছে এসে বলবেন, আমি তোমার মেন্টর হতে চাই?
না, তিনি শত ব্যস্ত। তুমি চাইলেও তিনি সহজে ধরা দেবেন না। আর ধরা দিলেও তিনি তোমার সাথে কঠোর হবেন, তোমাকে নানা পরীক্ষার মধ্যে ফেলবেন। একবার তোমার মনে হবে, তিনি তোমাকে তাঁর স্বার্থে কাজ করাচ্ছেন বা ব্যবহার করছেন। ভুল। তোমার মতো এই নাদান বালক তাঁকে কিভাবে সুবিধা দিবে? তিনি তো সাগরের ন্যায় বিশাল জলরাশি। একবার গভীরভাবে ভেবে দেখ, “শৈবাল দীঘীরে বলে উচ্চ করে শির, লিখে রেখ এক ফোঁটা দিলেম শিশির।”
এই জীবনে তোমাকে কি দরকার তাঁর? অথচ তোমারই দরকার ছিল তাঁকে। তুমি চিনতে পারনি। ভিশন দরকার ছিল। যিনি তোমাকে জীবনের শিক্ষা দিতে পারতেন। তুমি কোন খুঁজেও দেখনি তোমার মেন্টর কে! তুমি নিজেই নিজেকে পন্ডিত ও জ্ঞানী মনে করে এসেছিলে, যা ছিল তোমার অজ্ঞতা ও মিথ্যে অহংকার।
যদি কোনদিন মেন্টর খুঁজে পাও তবে তাঁর পায়ের কাছে কুকুর হয়ে বসে থাকোনা কেন? প্রভুভক্ত কুকুরের মতো; যেমন, প্লেটো সক্রেটিসের পায়ের কাছে বসেছিলেন।
তুমি যদি আগেই জানতে, রিয়েলিটি শকট্ জিনিসটি কি? কিভাবে ইহা ফেস করতে হয়; কিভাবে পরিশ্রম ও কৌশলের মাধ্যমে কর্মজীবন বা ব্যবসায় সফল হতে হয়; কিংবা তোমার ছাত্রজীবনের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুটি কিভাবে কর্মজীবনে তোমার সবচেয়ে বড় শত্রু বা প্রতিযোগী হয়ে উঠবে; তবে কতোইনা ভাল হতো!
যদি আগেই জানতে সবকিছুর তত্ত্ব-কৌশল, তবে তুমি এরূপ লেজে গোবরে হতে? না। তুমি সতর্ক হয়ে যেতে অনেক আগেই। পরিশ্রমী ও ন্যায়নিষ্ট হতে, হতে একজন দায়িত্বশীল মানুষ। অপরের দিকে আঙুল তুলতে না কখনও। কিংবা তুমি কি অদৃষ্টের দোষ দিতে পারতে? না। তুমি কেবল নিজেকেই দোষী করতে, কারণ তোমার মেন্টর তোমাকে শিক্ষিত করে তুলতেন, কিভাবে ট্রেস ম্যানেজমেন্ট করতে হয়, টিম ওয়ার্ক ও নেতৃত্ব দিতে হয় কিভাবে, সব শিক্ষা দিতেন।
অথচ চিনতে পারোনি তাঁকে।
তিনি কি তোমার পিতা? নাকি শিক্ষক? তিনিতো অন্য কেউ। তোমার সাথে তিনি কেন ফরমালিটি দেখাবেন?
সুজনের গল্পে আমরা দেখেছি যে তার বস কতো কঠোর ছিলেন!
তোমার মেন্টর কেবল তোমাকে শুধু গড়ে তুলতে চান, জীবনের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান দিয়ে, যোগ্য শিষ্য রূপে। যদি এরূপ মেন্টরের দেখা না পাও, তবে তুমি অভাগা বটে।
শুধু কি কর্মজীবন?
না। জীবনের জন্যও মেন্টর প্রয়োজন। তুমি ভাবনায় নিমজ্জিত হোও! দেখবে, জীবন তোমাকে কত প্রশ্ন করছে। গুগল-ইউটিউবের এত জ্ঞান, এত কথা তোমার মনে ধরবে না। কারণ তোমার জ্ঞান পিপাসা সাগর তুল্য।
এই পিপাসার মূল্য অনেক। জ্ঞানের পিপাসাই তাঁর (মেন্টর বা গুরু) কাছে নিয়ে যাবে তোমাকে। যদি জ্ঞান পিপাসা লাগে, তবে প্রশ্ন কর, নিজেকে। আবার প্রশ্ন কর, তোমার ভাল লাগা কাউকে, প্রশ্ন কর এবং প্রশ্ন কর। ফেস টু ফেস প্রশ্ন কর, মোবাইল ফোনে অবশ্যই নয়। যার কথায় তোমার মনে প্রশান্তি আসে, তিনিই আপাতত তোমার মেন্টর।
মনে রাখবে, নিজে অধিক জ্ঞানী হলেও তুমি ঐ জ্ঞান গর্ব নিয়েই কথা বল, শেয়ার কর, যে কারোর সাথে। ঝালাই করে নাও নিজেকে। আর যদি অহংকার পেয়ে বসে তোমাকে, তবে কোন দিন মেন্টর খুঁজে পাবে না।
লেখক: ক্লিন এন্ড গ্রিন ফাউন্ডেশন ও গরিব ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা।