খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫
২০২৫ সাল বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের বছর হিসেবে চিহ্নিত হলেও মার্কিন শ্রমবাজারে এটি এক বিশাল অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে। বিদায়ী বছরে কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই প্রায় ৫৫ হাজার মানুষ তাদের কর্মসংস্থান হারিয়েছেন, যার সরাসরি নেপথ্যে ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)। প্রযুক্তিবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ম্যাশেবল ও সিএনবিসির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। মার্কিন পরামর্শক সংস্থা ‘চ্যালেঞ্জার, গ্রে অ্যান্ড ক্রিস্টমাস’-এর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কোম্পানিগুলো উৎপাদনশীলতা বাড়াতে মানুষের পরিবর্তে ক্রমবর্ধমান হারে প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে মোট চাকরিচ্যুতির পরিমাণ ছিল ১.১৭ মিলিয়ন (১১ লাখ ৭০ হাজার), যা ২০২০ সালের করোনা মহামারির পর সর্বোচ্চ রেকর্ড। এর মধ্যে একটি বড় অংশ সরাসরি এআই দ্বারা প্রভাবিত। বিশেষ করে বছরের শেষ ভাগে এসে এই প্রবণতা আরও তীব্র হয়েছে। নভেম্বর মাসেই দেশটিতে ৭১ হাজার মানুষ চাকরি হারিয়েছেন, যার মধ্যে ৯ শতাংশ বা প্রায় ৬ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান কেড়ে নিয়েছে এআই। আমাজন, ওয়ালমার্ট এবং গুগলের মতো বিশ্ববিখ্যাত প্রযুক্তি ও খুচরা বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে এই প্রভাব সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান।
শ্রমবাজারের এই পরিবর্তন ও এআই-এর প্রভাব নিচের সারণিতে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
| বিষয়ের বিবরণ | পরিসংখ্যান ও তথ্যাবলি | বিশেষ পর্যবেক্ষণ |
|---|---|---|
| এআই-জনিত মোট ছাঁটাই | ৫৫,০০০ জন (প্রায়) | ২০২৪ সালের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। |
| বছরের মোট চাকরিচ্যুতি | ১.১৭ মিলিয়ন (১১.৭ লাখ) | ২০২০ সালের মহামারির পর সর্বোচ্চ হার। |
| নভেম্বরের চিত্র | ৭১,০০০ ছাঁটাই (এআই দায়ী ৯%) | বছরের শেষ প্রান্তিকে প্রকোপ বেড়েছে। |
| সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত খাত | প্রযুক্তি, খুচরা বিক্রয় ও কাস্টমার সার্ভিস | আমাজন ও ওয়ালমার্টে বড় ছাঁটাই। |
| প্রভাবিত জনগোষ্ঠী | তরুণ ও এন্ট্রি-লেভেল কর্মী | নতুন নিয়োগ বা ‘হায়ারিং ফ্রিজ’ বেড়েছে। |
| ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস | স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির আধিপত্য | দক্ষতা উন্নয়নে জোর দেওয়ার পরামর্শ। |
এই গণছাঁটাইয়ের সবচেয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে তরুণ প্রজন্মের ওপর। ওলফ রিসার্চের প্রধান অর্থনীতিবিদ স্টেফানি রথের মতে, এআই কেবল বর্তমান কর্মীদের কাজ কেড়ে নিচ্ছে না, বরং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথও সংকুচিত করছে। বড় বড় কোম্পানিগুলো এখন আর জুনিয়র বা এন্ট্রি-লেভেলের কর্মীদের নিয়োগ দিতে আগ্রহী নয়; তারা সেই কাজের জন্য এআই টুলস ব্যবহারকে সাশ্রয়ী মনে করছে। একে ‘হায়ারিং ফ্রিজ’ বা নিয়োগ স্থবিরতা হিসেবে অভিহিত করছেন বিশেষজ্ঞরা। এর ফলে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাস করা তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এআই বিপ্লব শ্রমবাজারের কাঠামো আমূল বদলে দিচ্ছে। কোম্পানিগুলো এখন এমন দক্ষ কর্মী খুঁজছে যারা এআই চালনা করতে সক্ষম। যারা পুরনো পদ্ধতিতে কাজ করতে অভ্যস্ত বা যাদের কাজের জায়গা সরাসরি রোবটিকস বা সফটওয়্যার দ্বারা দখলযোগ্য, তারাই মূলত এই ছাঁটাইয়ের শিকার হচ্ছেন। এই সংকট মোকাবিলায় কর্মীদের দ্রুত নতুন প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তোলা বা ‘আপস্কিলিং’ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছে ম্যাশেবল। ২০২৬ সালেও এই ছাঁটাই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে এক নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।