আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: 26শে আশ্বিন ১৪৩২ | ১১ই অক্টোবর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় দখলদার ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। শুক্রবার বাংলাদেশ সময় বিকাল ৫টার দিকে ইসরাইলি সেনারা জনবহুল এলাকা থেকে সরে যায়। এর পর থেকে দলে দলে বাস্তুচ্যুত মানুষ নিজেদের বাড়ির পথে যাত্রা শুরু করেছে। উপকূলবর্তী সড়কগুলোতে মানুষের ঢল লক্ষ্য করা গেছে।
গাজার উত্তরাঞ্চলে হাজার হাজার মানুষ আল-রশিদ সড়কে রাতভর অপেক্ষার পর সেনা প্রত্যাহারের খবর পেয়ে বাড়ির দিকে অগ্রসর হন। তবে গাজার ৫৩ শতাংশ এলাকা, বিশেষত সীমান্তবর্তী বাফার জোন, রাফা, খান ইউনিস, বেঈত হানুন ও ফিলাডেলফি করিডর এখনও ইসরাইলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আইডিএফ সতর্ক করেছে, এসব এলাকায় প্রবেশ বিপজ্জনক হতে পারে।
হামাসের শীর্ষ নেতা খলিল আল-হায়া এক ভিডিওবার্তায় জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ মধ্যস্থতাকারীদের কাছ থেকে তারা যুদ্ধের ‘সম্পূর্ণ সমাপ্তি’র নিশ্চয়তা পেয়েছেন। তিনি বলেন, হামাস দেশি-বিদেশি সংস্থা ও রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে একযোগে ফিলিস্তিনের স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনে কাজ করবে। যুক্তরাষ্ট্রও জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন ও স্থিতিশীলতা আনতে ২০০ সেনার একটি যৌথ টাস্কফোর্সে অংশ নেবে, তবে তারা গাজার ভিতরে মোতায়েন হবে না। টাস্কফোর্সে মিশর, কাতার, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিনিধিরাও থাকবেন।
এই যুদ্ধবিরতি এসেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায়। প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় ইসরাইল ও হামাসের পাশাপাশি মিশর, কাতার ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইসরাইল সেনা প্রত্যাহার, মানবিক সহায়তা প্রবেশ এবং বন্দি-জিম্মি বিনিময় শুরু করবে। হামাস ২০ জীবিত জিম্মি ও ২৮ মরদেহ মুক্তি দেবে, আর ইসরাইল ছাড়বে প্রায় ২ হাজার ফিলিস্তিনি বন্দি।
দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা গাজা যুদ্ধে ইতিমধ্যেই ৬৭ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার। ধ্বংসস্তূপে পরিণত গাজায় মানুষ আশায় বুক বাঁধছে—যুদ্ধ থেমে অবশেষে শান্তি ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে তারা।
বাড়িঘর ধ্বংস হলেও আনন্দ : যুদ্ধবিরতির পর হাজারো বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি শুক্রবার ফিরে যান ধ্বংসস্তূপে পরিণত বাড়িঘরে। কয়েক বছর ধরে তাঁবু ও আশ্রয়কেন্দ্রে মানবেতর জীবনযাপনের পর নিজ ভূমিতে পা রাখার আনন্দে মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সামনের দিনগুলোতে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিত্সাসহ মৌলিক প্রয়োজনগুলো অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকলেও তারা নিজ এলাকায় ফিরে এসেছে। উপকূলীয় সড়ক ধরে দীর্ঘ সারিতে মানুষ পায়ে হেঁটে গাজা নগরীর দিকে এগোয়, কেউ কাঁধে সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিস বহন করছেন, কেউ ভাঙা কাঠ বা পুরোনো মালপত্র কুড়িয়ে নিচ্ছেন।
৪০ বছরের ইসমাইল যায়েদা বলেন, ‘আল্লাহর রহমতে আমার ঘর এখনও দাঁড়িয়ে আছে, তবে আশপাশের সব বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। পুরো এলাকার রূপটাই পাল্টে গেছে।’ তবুও নিজের এলাকায় ফেরার আনন্দে তিনি খুশি।
দক্ষিণের খান ইউনিস শহরে ফিরে আসা মানুষজন নীরবে হেঁটে যাচ্ছিলেন ধুলোমাখা ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে। এক কিশোর কাঁধে বোঝা বহন করছিল, আর মধ্যবয়সী আহমেদ আল-ব্রিম একটি সাইকেল ঠেলছিল, যার সামনে-পেছনে বাঁধা ছিল কিছু কাঠ। তিনি বলেন, আমাদের এলাকা পুরো ধ্বংস হয়েছে। কোথায় থাকব জানি না, তবুও ঘরে ফেরার আনন্দ মন ভরিয়েছে।
মেহদি সাকলা বলেন, ‘আমাদের কোনো ঘর নেই—সব ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু ভাঙা ইট-পাথরের ওপর হলেও ফিরে আসতে পেরে খুশি। এই আনন্দই সবচেয়ে বড়।’
তবু অনিশ্চয়তা : ধ্বংসস্তূপের মধ্যে মানুষ ঘরে ফেরার আনন্দ উপভোগ করলেও সামনের দিনগুলোতে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। যুদ্ধবিরতির শর্তাবলি পুরোপুরি কার্যকর হবে কি না, গাজা পুনর্গঠনের ভবিষ্যত কী হবে—এসব প্রশ্ন এখনো ঝুলে আছে। তবে আপাতত সবচেয়ে বড় অর্জন হলো নিজ ভূমিতে ফিরে আসা।
খবরওয়ালা/টিএসএন