খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারি ২০২৬
মানবজীবন রক্ষার মতো মহৎ কাজ খুব কমই আছে। দুর্ঘটনা, বড় ধরনের অস্ত্রোপচার, প্রসূতি জটিলতা, থ্যালাসেমিয়া, ক্যানসার কিংবা ডেঙ্গুর মতো রোগে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ রক্তের অভাবে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়। ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তে স্বেচ্ছায় রক্তদান হয়ে ওঠে কারও জীবনের শেষ আশ্রয়। ‘প্রাণের টানে রক্তদান’ শুধু একটি সংগঠনের নাম নয়; এটি মানবসেবা, ইমানি দায়িত্ব ও নৈতিক চেতনার এক জীবন্ত প্রকাশ।
ইসলামে মানুষের জীবন রক্ষা সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ আমলগুলোর একটি। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন—
“আর যে একজন মানুষের প্রাণ রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতির প্রাণ রক্ষা করল।” (সুরা আল-মায়েদা: ৩২)
এই আয়াত প্রমাণ করে, একটি জীবন বাঁচানো কত বিশাল সওয়াবের কাজ। রক্তদান সেই আয়াতের বাস্তব ও কার্যকর প্রয়োগ, যেখানে একজন সুস্থ মানুষ নিজের সামান্য কষ্ট স্বীকার করে আরেকজনের জীবন রক্ষায় এগিয়ে আসে।
হাদিস শরিফেও মানবসেবার গুরুত্ব অত্যন্ত স্পষ্ট। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম সে-ই, যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী।” অন্য হাদিসে এসেছে, কোনো মুমিনের দুনিয়ার কষ্ট লাঘব করলে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার কষ্ট লাঘব করবেন। রক্তদানের মাধ্যমে যখন আমরা জীবন-মরণের সন্ধিক্ষণে থাকা একজন মানুষের পাশে দাঁড়াই, তখন এই হাদিসগুলোর বাস্তব শিক্ষা আমাদের কাজে রূপ নেয়।
ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, রক্তদান জায়েয ও প্রশংসনীয়—যদি এতে দাতার শরীরে মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা না থাকে। আলেমদের অভিমত অনুযায়ী স্বেচ্ছায়, মানবিক প্রয়োজনে এবং স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে রক্তদান করলে তা সদকা হিসেবে গণ্য হয় এবং এর জন্য দাতা সওয়াবের অধিকারী হন।
রক্তদানের একটি বড় বাস্তবতা হলো—প্রত্যেক মানুষের রক্ত সবার জন্য উপযোগী নয়। কোন রক্ত কোন প্রয়োজনে লাগে, তা জানা থাকলে জরুরি মুহূর্তে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়। নিচের ছকে বিষয়টি সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—
| রক্তের গ্রুপ | কাদের দেওয়া যায় | জরুরি ব্যবহারে গুরুত্ব |
|---|---|---|
| ও পজিটিভ | অধিকাংশ পজিটিভ গ্রুপ | সর্বাধিক চাহিদাসম্পন্ন |
| ও নেগেটিভ | সব গ্রুপে | জরুরি অবস্থায় অমূল্য |
| এ পজিটিভ | এ ও এবি পজিটিভ | সাধারণ অস্ত্রোপচার |
| বি পজিটিভ | বি ও এবি পজিটিভ | নিয়মিত রোগীদের জন্য |
| এবি পজিটিভ | কেবল এবি পজিটিভ | বিরল কিন্তু প্রয়োজনীয় |
রক্তদান শুধু তাৎক্ষণিক উপকার নয়; এটি সদকা জারিয়ার সম্ভাবনাও তৈরি করে। আপনি যাকে রক্ত দিলেন, সে বেঁচে গিয়ে আবার অন্যের উপকারে আসতে পারে। এভাবে একটি নেক কাজ বহুগুণ সওয়াবের দ্বার খুলে দেয়।
আমাদের করণীয় হলো—সুস্থ থাকলে নিয়মিত রক্তদান করা, মানুষকে এই বিষয়ে সচেতন ও উৎসাহিত করা এবং প্রয়োজনে পরিচয় না জেনেও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া। নিয়ত হওয়া উচিত একটাই—আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মানুষের প্রাণ রক্ষা।
পরিশেষে বলা যায়, ‘প্রাণের টানে রক্তদান’ কুরআন ও হাদিসে নির্দেশিত মানবসেবার এক বাস্তব রূপ। একটি ফোঁটা রক্ত কারও কাছে হয়ে উঠতে পারে নতুন জীবনের আলো। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই মহৎ কাজে অংশ নেওয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।