ফিদা হাসান রিশলু
প্রকাশ: 30শে আশ্বিন ১৪৩২ | ১৫ই অক্টোবর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাষ্ট্রের চাইতে সমাজকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। তিনি সংঘবদ্ধ মানুষের কথা ভাবতেন এবং মানুষের আত্মিক উন্নয়নের বিষয়টি প্রাধান্য দিতেন। মনে হতো, রাষ্ট্র অল্পদিন আগের, আর সমাজ বহুদিনের ইতিহাস বহন করে। রবীন্দ্রনাথ হয়তো বিশ্বাস করতেন, সচেতন ও আত্মশক্তিসম্পন্ন সমাজই রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করবে। ঔপনিবেশিক আমলের রাষ্ট্রীয় শোষণ-পীড়নের বিরুদ্ধে তার সমাজকেন্দ্রিক চিন্তা অনেকটাই ছিল যুগান্তকারী।
এর আগে উপমহাদেশের প্রথম রাষ্ট্রচিন্তক বঙ্কিমচন্দ্র চট্রোপাধ্যায় রাষ্ট্রকেই প্রাধান্য দিয়ে ধর্মীয় পুনর্জাগরণের দিকে এগিয়েছিলেন। ফলে বঙ্কিমচন্দ্রের রাষ্ট্রচিন্তা এবং রবীন্দ্রনাথের সমাজকামনা ইংরেজদের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কোপে পড়তে থাকে। ভারতের ভাগাভাগি হয়ে ভারত ও পাকিস্তান দুই রাষ্ট্রের জন্ম হয়। পাকিস্তান অংশের পূর্ববর্তী মানুষদের তখন বোঝা যায়, সমাজ নয়, রাষ্ট্রই প্রকৃত নিয়ন্ত্রক।
রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্তি পেতে বাংলাদেশে মানুষ দীর্ঘ ২৩ বছরের রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মাধ্যমে মহান মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে। তবে স্বাধীনতার পরও কি শেষ হয় রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ? নাকি দেখা যায় আবারো পুরোনো কুকীর্তির পুনরাবির্ভাব? এই প্রশ্নের উত্তর সম্পূর্ণ অজানা নয়।
বাংলাদেশের আইন, বিচারালয় ও প্রশাসন শুরু থেকেই রাজনীতির সংকীর্ণ চোরাপথে বিকৃত হয়। ভিন্নমতের পারস্পরিক সংঘাত এবং দূর্বৃত্তায়ন, কখনো সামরিক কখনো বেসামরিক ক্ষমতার দমনবাজী সামাজিক শৃঙ্খলাকে ধ্বংস করে। এ অবস্থায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পরের রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাতছাড়া হয়ে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীদের দখলে চলে যায়। এই পরিস্থিতিতে সমাজ-রাজনীতির চালিকা প্রাচীন ও আধুনিক, বহুমুখী জ্ঞানপাপী এবং ইউটিউবারদের মাধ্যমে মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও সামাজিকায়ন মধ্যযুগীয় প্রতিক্রিয়াশীলতার ছায়ায় নিমজ্জিত হয়ে পড়ে।
কোনো সমাজ বা রাষ্ট্র কতটা প্রগতিশীল, কতটা স্থির, তা নির্ধারণ করে মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, সহযোগিতা, শ্রদ্ধা এবং সহমর্মিতা কতটুকু। আর উল্টো দিকে সমাজ বা রাষ্ট্রের উল্টোমুখিতা নির্ধারণ করে মানুষের মধ্যে বিদ্বেষ, ঘৃণা ও শত্রুতা কতটুকু। সমাজ বা রাষ্ট্রের নেতৃত্বের দায়িত্ব হলো এই নেতিবাচক প্রভাবকে প্রগতির পথে ঘুরিয়ে নিয়ে যাওয়া।
যদি রাজনীতি বিদ্বেষ বা প্রতিহিংসার চর্চা বন্ধ না করে, তবে তা জনমানসে সামাজিক ব্যাধি হিসেবে আবির্ভূত হয়। রাজনীতিতে সুবিধা পাওয়ার আশায় এই ঘৃণাচর্চা ব্যবহার করা হয়, যা সমাজের মানুষের মধ্যে সম্পর্ক, যোগাযোগ ও বিশ্বাসকে ক্ষয় করে। বাংলাদেশের সমাজে এই ক্ষয় কখনোই কম হয়নি; বর্তমানেও তা ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে ছড়িয়ে গেছে।
বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ আকবর আলী খান তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, মানুষ যত বিশ্বাসের সঙ্গে মিলিত হবে, সামাজিক পুঁজি তত বৃদ্ধি পাবে। সামাজিক পুঁজির অভাবের কারণে বাংলাদেশ অঞ্চলে বৃহৎ সাম্রাজ্য টেকসই হয়নি। খন্ডরাজ্যগুলিই বারবার বাংলার মাটিতে ফুটেছে এবং ঝরে পড়েছে। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম বন্দর লিজ, আরাকান করিডর এবং সেন্টমার্টিনে মার্কিন সৈন্যদের আগমন এই রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রমাণ।
লেখক: ফিদা হাসান রিশলু, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট
খবরওয়ালা/শরিফ