রাজধানীর পল্লবীতে আলোচিত শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রধান আসামি সোহেল রানা জেল আপিলে নিজের অপরাধ স্বীকার করে আদালতের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, দীর্ঘদিনের মাদকাসক্তি, আর্থিক সংকট এবং পারিবারিক অস্থিরতার কারণে তিনি এমন একটি নৃশংস ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। একই সঙ্গে নিজের পরিবারের দুরবস্থা ও একমাত্র সন্তানের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে দণ্ড লঘুর আবেদন জানিয়েছেন।
রোববার হাইকোর্টে শুনানির জন্য গৃহীত জেল আপিলে সোহেল রানা বলেন, তিনি একজন অটোরিকশা গ্যারেজের মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করতেন এবং দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকে আসক্ত ছিলেন। তার ভাষ্যমতে, মাদকাসক্তির কারণে পরিবারে প্রায়ই কলহ-বিবাদ হতো এবং মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় ঘটনাটি ঘটে যায়। তিনি দাবি করেন, পূর্বে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না এবং ঘটনাটি ঘটার সময় তিনি নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ছিলেন।
জবানবন্দিতে সোহেল আরও উল্লেখ করেন যে, তার পরিবারের দেখভাল করার মতো আর কেউ নেই। তিনি আদালতের কাছে নিজের ভুল স্বীকার করে অনুতাপ প্রকাশ করেন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তবে আদালত তার এই বক্তব্যকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে, তা পরবর্তী শুনানি ও আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে।
অন্যদিকে, একই মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তার জেল আপিলে নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করেছেন। তিনি আদালতের কাছে খালাস প্রার্থনা করে বলেছেন, ঘটনার সঙ্গে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই এবং তাকে ভুলভাবে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
গত ১১ জুন কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে হাইকোর্টে জেল আপিল দাখিল করেন সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তার। রোববার আদালত আপিল দুটি শুনানির জন্য গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে মামলাটি এখন উচ্চ আদালতের বিচারিক পর্যালোচনার পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
ঘটনাটি দেশের অন্যতম আলোচিত শিশু নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড হিসেবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। মামলার নথি অনুযায়ী, গত ১৯ মে সকালে পল্লবীর একটি আবাসিক এলাকায় দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয়। পরে তাকে কৌশলে প্রতিবেশীর বাসায় নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠে। পরিবারের সদস্যরা খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে সন্দেহজনক পরিস্থিতি দেখে প্রতিবেশীর ফ্ল্যাটে প্রবেশ করেন এবং সেখানে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে স্বপ্নাকে হেফাজতে নেয় এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে। তদন্ত শেষে দ্রুত অভিযোগপত্র দাখিল করা হয় এবং মামলাটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিচারিক কার্যক্রমে নেওয়া হয়।
মামলার গুরুত্বপূর্ণ সময়রেখা
তারিখ
ঘটনা
১৯ মে
রামিসা নিখোঁজ ও হত্যাকাণ্ড সংঘটিত
২০ মে
পল্লবী থানায় মামলা দায়ের
২৪ মে
তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দাখিল
১ জুন
অভিযোগ গঠন ও বিচার শুরুর আদেশ
২ জুন
সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু
৩ জুন
আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন
৪ জুন
যুক্তিতর্ক উপস্থাপন সমাপ্ত
৭ জুন
রায় ঘোষণা
১১ জুন
হাইকোর্টে জেল আপিল দাখিল
১৪ জুন
জেল আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ
মামলাটির তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া তুলনামূলক দ্রুত সম্পন্ন হওয়ায় এটি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। বর্তমানে উচ্চ আদালতে জেল আপিলের শুনানির মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামির দণ্ড ও মামলার বিভিন্ন দিক পুনরায় বিচারিক পর্যালোচনার আওতায় আসবে। আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করবে মামলার পরবর্তী আইনি গতিপথ।