খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম ঘটনাবহুল ও সংকটময় সময় নিয়ে সম্প্রতি এক চাঞ্চল্যকর সাক্ষাৎকার দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন-পরবর্তী পরিস্থিতি এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছর নিয়ে তাঁর দেওয়া এই বক্তব্যে উঠে এসেছে ক্ষমতার পালাবদলের নেপথ্যের অজানা ও রোমহর্ষক সব তথ্য। বঙ্গভবনের নিভৃত কোণে কাটানো সেই সময়গুলোকে তিনি ‘প্রাসাদবন্দি’ জীবন হিসেবে অভিহিত করেছেন।
রাষ্ট্রপতির বর্ণনায়, ৫ আগস্টের দুপুর ছিল চরম অনিশ্চয়তায় ঘেরা। বেলা ১২টা পর্যন্তও বঙ্গভবনের পরিবেশ ছিল থমথমে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গভবনে আসার কথা ছিল এবং তাঁর জন্য হেলিকপ্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। কিন্তু মাত্র ৪০ মিনিটের ব্যবধানে পুরো দৃশ্যপট পাল্টে যায়। দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশত্যাগ করেছেন। রাষ্ট্রপতির ভাষায়, সেই সময়টি ছিল দেশের জন্য এক চরম ক্রান্তিকাল।
শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর বিকেল ৩টার দিকে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান রাষ্ট্রপতির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর তিন বাহিনীর প্রধানদের সাথে বঙ্গভবনে টানা তিন ঘণ্টা বৈঠক চলে। রাষ্ট্রপতি জানান, সেই সংকটময় মুহূর্তে দেশে জরুরি অবস্থা বা সামরিক শাসন (মার্শাল ল) জারির জন্য তাঁর ওপর প্রবল চাপ ছিল। তবে তিনি এবং সশস্ত্র বাহিনী প্রধানগণ সংবিধানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পক্ষে অনড় অবস্থান নেন। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, সেনাপ্রধানের মধ্যে ক্ষমতার কোনো মোহ ছিল না, যা দেশকে বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছে।
৫ আগস্টের ঘটনাক্রম ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তসমূহ:
| সময়/পর্যায় | ঘটনা ও গৃহীত সিদ্ধান্ত |
| দুপুর ১২:০০ – ১২:৪০ | প্রধানমন্ত্রীর বঙ্গভবনে আসার পরিকল্পনা বাতিল এবং দেশত্যাগ। |
| বিকেল ৩:০০ | সেনাপ্রধানের সাথে রাষ্ট্রপতির প্রথম ফোনালাপ ও পরিস্থিতি অবহিতকরণ। |
| বিকেল ৪:০০ – ৭:০০ | তিন বাহিনী প্রধানের সাথে বৈঠক; অন্তর্বর্তী সরকারের প্রাথমিক রূপরেখা। |
| রাত ৮:০০ – ১০:০০ | রাজনৈতিক দল ও ছাত্রনেতাদের সাথে সমন্বয় বৈঠক। |
| রাত ১১:০০ | জাতির উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতির ভাষণ ও সংসদ ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা। |
| ৮ আগস্ট | সুপ্রিম কোর্টের মতামত গ্রহণ ও অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ গ্রহণ। |
সংবিধানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সরাসরি বিধান না থাকায় একটি বড় ধরনের আইনি শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। রাষ্ট্রপতি জানান, তিনি নিজেই প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনি মতামত গ্রহণ করেন। এই আইনি ব্যাখ্যাই ছিল তাঁর প্রধান ‘রক্ষাকবচ’। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম প্রস্তাব করেন। ড. ইউনূস তখন ফ্রান্সে চিকিৎসাধীন থাকায় যোগাযোগে কিছুটা বিলম্ব হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁর নেতৃত্বেই সরকার গঠিত হয়।
সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে আবেগঘন ও চাঞ্চল্যকর অংশ ছিল রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত কষ্টের বর্ণনা। তিনি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পুরোটা সময় তাঁকে কার্যত বঙ্গভবনে এক প্রকার গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছিল। তাঁর মৌলিক অধিকারগুলো ক্ষুণ্ন করা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। তিনি বলেন:
দুই ঈদে তাঁকে জাতীয় ঈদগাহে নামাজ পড়তে যেতে দেওয়া হয়নি।
শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও হার্টের চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর বা লন্ডনে যাওয়ার অনুমতি মেলেনি।
তাঁর মতে, তাঁকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে পদত্যাগে বাধ্য করাই ছিল তৎকালীন প্রশাসনের মূল উদ্দেশ্য।
দীর্ঘ প্রতিকূলতা পেরিয়ে দেশে নির্বাচিত সরকার আসার পর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এখন নিজেকে ভারমুক্ত ও স্বস্তিবোধ করছেন। নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের প্রশংসা করে তিনি বলেন, দেশে এখন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরেছে। রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তিনি আবারও তাঁর পুরনো পেশা—আইন পেশায় ফিরে যেতে চান এবং আইনি পরামর্শক হিসেবে বাকি জীবন অতিবাহিত করার ইচ্ছা পোষণ করেন।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের এই খোলামেলা সাক্ষাৎকারটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অন্ধকার ও জটিল অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেবে। ক্ষমতা, ষড়যন্ত্র এবং ব্যক্তিজীবনের টানাপড়েনের এই আখ্যান আগামীর রাজনীতিতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।