খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 1শে কার্তিক ১৪৩২ | ১৬ই অক্টোবর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বাজারে একটি তালার দাম মাত্র ১৭৩ টাকা, কিন্তু পশ্চিম রেল তা কিনেছে ৫ হাজার ৫৯০ টাকায়। একইভাবে ২৬০ টাকার বালতি কেনা হয়েছে ১ হাজার ৮৯০ টাকায়, ৬৫ টাকার বাঁশির দাম ধরা হয়েছে ৪১৫ টাকা, আর ৯৮ টাকার ঝাড়ু কেনা হয়েছে ১ হাজার ৪৪০ টাকায়।
পশ্চিম রেলের ২০১৮–১৯ অর্থবছরের এই কেনাকাটায় ভয়াবহ দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ ঘটনায় বুধবার (১৫ অক্টোবর) দুদক মামলা করেছে ১৮ জনের বিরুদ্ধে, যাদের মধ্যে পশ্চিম রেলের সাবেক দুই মহাব্যবস্থাপকও (জিএম) রয়েছেন।
দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক মো. রোকনুজ্জামান বাদী হয়ে সমন্বিত জেলা কার্যালয়, রাজশাহীতে মামলাটি দায়ের করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, আসামিরা সরকারি ক্রয়ে দুই কোটি ১৮ লাখ ১৪ হাজার ১৯৬ টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
আসামিদের মধ্যে রয়েছেন— সাবেক জিএম খোন্দকার শহিদুল ইসলাম ও মজিবুর রহমান, সাবেক সিওসি খায়রুল আলম ও বেলাল হোসেন সরকার, সাবেক এসিওএস জাহিদ কাওছার, তৎকালীন ডেপুটি সিসিএম ফুয়াদ হোসেন আনন্দ, ডিএফএ শ্যামলী রাণী রায়, উচ্চমান সহকারী আলামিন তালুকদার, সাবেক ডিএফএ (অর্থ) আলমগীর হোসেন, তৎকালীন সিওপিএস এএমএম শাহনেওয়াজ, এফএ অ্যান্ড সিএও শরিফুল ইসলাম, ডেপুটি সিওপিএস হাসিনা খাতুন, সাবেক এফএ অ্যান্ড সিএও মসিহ উল হাসান, সাবেক এসিসিএম শেখ আব্দুল জব্বার, সাবেক অতিরিক্ত এফএ অ্যান্ড সিএও গোলাম রব্বানী, তৎকালীন অতিরিক্ত এফএ অ্যান্ড সিও গোলাম রহমান, সাবেক এফএ অ্যান্ড সিও সরোজ কান্তি দেব এবং সাবেক সিসিএম মিহির কান্তি গুহ।
দুদক জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিভিন্ন পণ্য বাজারদরের চেয়ে ১৫ থেকে ৩৩ গুণ বেশি দামে কিনেছেন। রেলের অভ্যন্তরীণ তদন্তেও এসব অনিয়মের প্রমাণ মেলে। তদন্ত কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. ভুবন চন্দ্র বিশ্বাস।
দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিমের অনুসন্ধানে দেখা যায়, একটি তালার বাস্তব মূল্য ভ্যাট ও মুনাফাসহ ১৭৩ টাকা হলেও ঠিকাদারকে দেওয়া হয়েছে ৫ হাজার ৫৯০ টাকা। শুধু তালা কেনাতেই আত্মসাৎ হয়েছে প্রায় ১০ লাখ ৮৩ হাজার ৪০০ টাকা।
এছাড়া ২৬০ টাকার বালতি ১ হাজার ৮৯০ টাকায়, ৬৫ টাকার বাঁশি ৪১৫ টাকায় এবং ৯৮ টাকার ঝাড়ু ১ হাজার ৪৪০ টাকায় কেনার মাধ্যমে লুট হয়েছে প্রায় ১৮ লাখ ৮২ হাজার টাকা।
আরও দেখা যায়, ৫০টি ভিআইপি পর্দা কেনায় ব্যয় দেখানো হয়েছে ৪৪ লাখ ৪১ হাজার ৩০০ টাকা, লাগেজ ফিতাসহ ওয়াগন কার্ড কেনায় ২৬ লাখ ৩৭ হাজার ২৫০ টাকা, এবং ভিজিটিং চেয়ার, পেডাল ডাস্টবিন, লাগেজ ট্রলি, পাপোশ, ফটোকপিয়ার, স্টিল ফ্রেম চেয়ার, লেদার ক্যাশ ব্যাগসহ ১৩ ধরনের সামগ্রী কিনতে আত্মসাৎ করা হয়েছে ১ কোটি ২৮ লাখ ৫৩ হাজার ৪৪৬ টাকা। চারটি টেন্ডারের মাধ্যমে এসব ১৭ ধরনের পণ্য কেনাকাটায় মোট আত্মসাৎ হয়েছে দুই কোটি ১৮ লাখ টাকারও বেশি।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাক্কলন কমিটি বাজারদর যাচাই না করেই প্রকৃত মূল্যের চেয়ে ১৫–৩৩ গুণ বেশি দর নির্ধারণ করে দরপত্র আহ্বান করে। ১৬৬টি তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ছয়টি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নেয় এবং তারাই কার্যাদেশ পায়। মূল্যায়ন কমিটিও বাজারদর যাচাই না করে ইচ্ছাকৃতভাবে অতিমূল্যের দর গ্রহণ করে।
দুদক বলেছে, অনুমোদনকারী কর্মকর্তারা দরপত্র বাতিল বা পুনরায় আহ্বান করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা না করে অনিয়মিতভাবে দরপত্র অনুমোদন দিয়েছেন। প্রাক্কলন কমিটি, মূল্যায়ন কমিটি, অনুমোদনকারী কর্মকর্তা ও ঠিকাদাররা পরস্পরের যোগসাজশে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।
দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আমির হোসাইন জানিয়েছেন, মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। এখন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হবে, এরপর পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
খবরওয়ালা/এমএজেড