খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
লিবিয়ার দীর্ঘকালীন শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির উত্তরসূরি ও আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি নিহত হয়েছেন। মঙ্গলবার দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর জিনতানে এক সশস্ত্র হামলায় তিনি প্রাণ হারান। লিবিয়ার অস্থিতিশীল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সাইফ আল-ইসলামের এই আকস্মিক প্রস্থান একটি বড় ধরনের শূন্যতা ও নতুন উত্তেজনার জন্ম দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
লিবিয়ায় নিয়োজিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সূত্র অনুযায়ী, গত এক দশক ধরে সাইফ আল-ইসলাম জিনতান শহরকে কেন্দ্র করে তাঁর রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন। মঙ্গলবার সেখানেই তিনি অতর্কিত হামলার শিকার হন এবং গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। ৫৩ বছর বয়সী এই নেতার মৃত্যুর সংবাদটি নিশ্চিত করেছেন তাঁর রাজনৈতিক উপদেষ্টা আবদুল্লাহ ওসমান।
তবে লিবিয়ার বর্তমান প্রেক্ষাপটে কারা এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে রয়েছে—তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। লিবিয়া সরকার এখন পর্যন্ত এই সংবেদনশীল বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রদান করেনি। এলাকাটিতে বর্তমানে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
মুয়াম্মার গাদ্দাফির সন্তানদের মধ্যে সাইফ ছিলেন সবচেয়ে মেধাবী ও মার্জিত। তিনি পাশ্চাত্যে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং ইংরেজি ভাষায় অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। ২০০০ সালের শুরুতে লিবিয়ার ওপর থেকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে তিনি পর্দার আড়ালে প্রধান কারিগর হিসেবে কাজ করেছিলেন।
নিচে সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফির জীবন ও রাজনৈতিক পরিক্রমার একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা দেওয়া হলো:
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
| পূর্ণ নাম | সাইফ আল-ইসলাম মুয়াম্মার গাদ্দাফি |
| জন্ম | ৫ জুন, ১৯৭২; ত্রিপোলি, লিবিয়া |
| শিক্ষা | পিএইচডি (লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস – ২০০৮) |
| রাজনৈতিক ভূমিকা | লিবিয়ার সাবেক ডি-ফ্যাক্টো প্রধানমন্ত্রী ও গাদ্দাফির উত্তরাধিকারী |
| বন্দিত্বকাল | ২০১১ সালে বিদ্রোহীবাহিনীর হাতে বন্দী (জিনতান) |
| মুক্তি | ২০১৭ সালে সাধারণ ক্ষমার আওতায় কারামুক্তি |
| মৃত্যু | ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬; জিনতান, লিবিয়া |
সাইফ আল-ইসলাম লিবিয়ার দমনমূলক রাজতন্ত্রের ভেতরে থেকেও নিজেকে একজন সংস্কারবাদী হিসেবে উপস্থাপন করতে চেয়েছিলেন। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস থেকে তিনি যখন পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন, তখন তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল বিশ্ব শাসনের সংস্কার। তাঁর এই প্রগতিশীল ভাবমূর্তি লিবিয়ার তরুণ প্রজন্মের একাংশের কাছে তাঁকে জনপ্রিয় করে তুলেছিল।
তবে ২০১১ সালের আরব বসন্তের সময় তিনি তাঁর বাবার পক্ষ অবলম্বন করেন এবং বিদ্রোহীদের দমনে কঠোর অবস্থান নেন। ২০১১ সালে মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর তিনি দেশ ছেড়ে পালানোর চেষ্টাকালে জিনতানে বিদ্রোহীদের হাতে ধরা পড়েন। এরপর দীর্ঘদিন তিনি সেখানে অন্তরীণ ছিলেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) তাঁর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল, কিন্তু লিবিয়ার স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে হস্তান্তরে অসম্মতি জানায়।
২০১৭ সালে মুক্তি পাওয়ার পর থেকে তিনি অনেকটা নিভৃতে ছিলেন, তবে সম্প্রতি লিবিয়ার নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে তিনি পুনরায় আলোচনায় আসেন। তাঁর এই প্রস্থান লিবিয়ার ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত বিভিন্ন পক্ষের সমীকরণকে পাল্টে দিতে পারে। লিবিয়ার শান্তি প্রক্রিয়া এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনের ওপর এই হত্যাকাণ্ডের কী প্রভাব পড়ে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।