খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশের ক্রীড়া সরঞ্জাম উৎপাদন শিল্পে এক নতুন বিপ্লব ঘটিয়েছে রাজশাহীর প্রতিষ্ঠান ‘এমকেএস স্পোর্টস’। রাজশাহী নগরীর বারো রাস্তার মোড় এলাকায় অবস্থিত এই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে বিশ্বমানের ক্রিকেট ব্যাট তৈরি করে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের নাম উজ্জ্বল করছে। হুসাইন মোহাম্মদ আফতাব শাহীনের হাত ধরে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ এখন কেবল দেশের চাহিদা মেটানো নয়, বরং বিশ্বের ১৪টি দেশে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লেখা ব্যাটের জয়গান গাইছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) অনুমোদন পাওয়ার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি পেশাদার ক্রিকেটে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে।
রাজশাহীর তরুণ উদ্যোক্তা হুসাইন মোহাম্মদ আফতাব শাহীন ২০০৪ সাল থেকে ক্রিকেট ব্যাটের প্রকৌশল ও গঠনশৈলী নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। দীর্ঘদিন ‘ব্যাট ডক্টর’ হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতায় তিনি শচীন টেন্ডুলকার ও বিরাট কোহলির মতো বিশ্বসেরা ব্যাটারদের ব্যাটের সূক্ষ্ম ত্রুটি সংশোধন করেছেন। তাঁর এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করেই ২০২৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ‘এমকেএস স্পোর্টস’। এই যাত্রায় শাহীনের সঙ্গী হয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় দলের দুই তারকা ক্রিকেটার ইমরুল কায়েস ও মেহেদী হাসান মিরাজ। বর্তমানে এই কারখানায় ৬০ জনেরও বেশি দক্ষ কর্মী নিয়োজিত রয়েছেন।
বাংলাদেশে প্রতি বছর পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ ক্রিকেট ব্যাট আমদানি করা হয়। অভ্যন্তরীণ এই বাজারের আর্থিক মূল্য প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ কোটি টাকা। এমকেএস স্পোর্টস-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এই বিশাল বাজারে দেশীয় অংশীদারিত্ব বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। উন্নত মানের উইলো ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের পাশাপাশি বিদেশের ক্রিকেটাররাও এখন রাজশাহীর তৈরি এই ব্যাটের ওপর আস্থা রাখছেন।
এমকেএস স্পোর্টস-এর এক নজরে তথ্যচিত্র:
| বিষয়ের বিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| প্রতিষ্ঠানের নাম | এমকেএস (MKS) স্পোর্টস। |
| অবস্থান | বারো রাস্তার মোড়, রাজশাহী নগরী। |
| মূল কারিগর ও উদ্যোক্তা | হুসাইন মোহাম্মদ আফতাব শাহীন। |
| অংশীদার | ইমরুল কায়েস ও মেহেদী হাসান মিরাজ। |
| অনুমোদন | আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)। |
| রপ্তানি বাজার | ১৪টি দেশ (বর্তমানে)। |
| কর্মসংস্থান | ৬০ জনের বেশি কর্মী। |
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের মতো ক্রীড়া সরঞ্জাম খাতেও ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগ এখন গৌরবের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এমকেএস স্পোর্টস-এর তৈরি ব্যাট ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো ক্রিকেট পরাশক্তি দেশগুলোতে রপ্তানি হচ্ছে। শাহীনের প্রকৌশল দক্ষতা এবং ক্রিকেটারদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানের কারণে ব্যাটের ব্যালেন্স ও স্থায়িত্ব আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে। এটি কেবল একটি ব্যবসা নয়, বরং বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (SME) বিকাশের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে ১৫০-২০০ কোটি টাকার যে বিশাল চাহিদা রয়েছে, তার একটি বড় অংশ বর্তমানে আমদানিনির্ভর। এমকেএস স্পোর্টস-এর মতো দেশীয় উদ্যোক্তাদের সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সহজলভ্য করা গেলে এই আমদানি নির্ভরতা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব। শাহীনের লক্ষ্য হলো, অদূর ভবিষ্যতে বিশ্বের প্রতিটি টেস্ট খেলুড়ে দেশের অন্তত একজন শীর্ষ ব্যাটারের হাতে রাজশাহীর তৈরি ব্যাট পৌঁছে দেওয়া।
এমকেএস স্পোর্টস প্রমাণ করেছে যে, মেধা ও সঠিক কারিগরি জ্ঞান থাকলে বাংলাদেশেই বিশ্বমানের প্রযুক্তিগত পণ্য উৎপাদন সম্ভব। হুসাইন মোহাম্মদ আফতাব শাহীনের এই উদ্যোগ তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা। দেশের ক্রীড়া খাতের এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকলে একদিন বৈশ্বিক স্পোর্টস ব্র্যান্ডগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের নাম প্রথম সারিতে থাকবে—এমনটিই প্রত্যাশা সকল ক্রীড়াপ্রেমীর।