খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ২১ ডিসেম্বর ২০২৫
সমাজে একটি আরামদায়ক কিন্তু বিভ্রান্তিকর ধারণা দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত—মিথ্যা প্রোপাগান্ডার ফাঁদে মূলত অশিক্ষিত জনগোষ্ঠীই পড়ে। এই ধারণা আমাদের এক ধরনের আত্মতুষ্টি দেয়, যেন শিক্ষা অর্জনের সঙ্গে সঙ্গেই মানুষ ভ্রান্তি থেকে মুক্ত হয়ে যায়। কিন্তু বাস্তবতা আরও কঠিন ও অস্বস্তিকর। বিশ্বব্যাপী গবেষণা ও সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা বলছে, শিক্ষিত জনগোষ্ঠীও ব্যাপকভাবে মিথ্যা প্রোপাগান্ডার শিকার হয়, অনেক ক্ষেত্রে আরও সূক্ষ্ম ও পরিকল্পিত প্রোপাগান্ডার।
এটি কোনো ব্যতিক্রমী ব্যর্থতা নয়; বরং মানবিক মনস্তত্ত্বের স্বাভাবিক দুর্বলতার ফল। শিক্ষা মানুষকে তথ্য দেয়, কিন্তু সবসময় চিন্তার শৃঙ্খলা বা যাচাইয়ের অভ্যাস দেয় না। ফলে ডিগ্রি, পদবি বা পেশাগত সাফল্য থাকা সত্ত্বেও মানুষ ভুল তথ্যকে প্রশ্নহীনভাবে গ্রহণ করে নেয়। শিক্ষা আর সমালোচনামূলক চিন্তার মধ্যে যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে, তা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই।
শিক্ষিত সমাজের আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো আদর্শগত পক্ষপাত। মানুষ সাধারণত সেই তথ্যই বিশ্বাস করতে চায়, যা তার পূর্বধারণা, রাজনৈতিক অবস্থান বা বিশ্বাসকে সমর্থন করে। এই প্রবণতা—মনোবিজ্ঞানের ভাষায় confirmation bias—প্রোপাগান্ডার সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র। যুক্তি নয়, পরিচিত বিশ্বাসই তখন সিদ্ধান্তের মানদণ্ড হয়ে ওঠে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় আবেগ। ধর্ম, দেশপ্রেম, পরিচয়, ভয় কিংবা ঘৃণা—এই আবেগগুলো সক্রিয় হলে যুক্তি স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল হয়ে পড়ে। আধুনিক প্রোপাগান্ডা তাই তথ্য দিয়ে নয়, আবেগ দিয়ে আঘাত করে। শিক্ষিত মানুষও এই আবেগীয় ঝাঁকুনিতে যুক্তিবোধ হারাতে পারেন—এতে আশ্চর্যের কিছু নেই।
আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো বিশ্বাসযোগ্যতার ছদ্মবেশ। ভুয়া তথ্য আজ আর অচেনা উৎস থেকে আসে না। আসে তথাকথিত বিশেষজ্ঞ, বিদেশি গবেষণা, আন্তর্জাতিক মিডিয়া বা পরিচিত মুখের উদ্ধৃতি দিয়ে। শিক্ষিত মানুষ উৎসের নাম দেখেই নিশ্চিন্ত হন, কিন্তু উৎসের ভেতরের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করার সময় বা ধৈর্য অনেক সময় থাকে না।
এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে তথ্যের অতিরিক্ততা। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ খবর, পোস্ট, বিশ্লেষণ আমাদের সামনে আসে। সবকিছু যাচাই করার মানসিক শক্তি মানুষের নেই। ফলে সহজ ব্যাখ্যা, চটকদার উপসংহার বা নাটকীয় গল্পই সত্য বলে ধরে নেওয়া হয়। এখানেই প্রোপাগান্ডা সবচেয়ে সফল হয়।
সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয়টি হলো অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস। “আমি তো শিক্ষিত, আমি ধোঁকায় পড়ব না”—এই বিশ্বাসই মানুষকে সবচেয়ে সহজে ধোঁকায় ফেলে। এই আত্মপ্রবঞ্চনাই শিক্ষিত সমাজকে প্রোপাগান্ডার সামনে অনেক সময় আরও অসহায় করে তোলে।
আজকের প্রোপাগান্ডা আর সাদামাটা নয়। এটি মনোবিজ্ঞান, ডেটা বিশ্লেষণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অ্যালগরিদম ব্যবহার করে মানুষের দুর্বলতা লক্ষ্য করে তৈরি হয়। শুধু সাধারণ শিক্ষা দিয়ে এর মোকাবিলা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সচেতনতা, আত্মসমালোচনা এবং চিন্তার শৃঙ্খলা।
এই প্রেক্ষাপটে আমাদের করণীয় কী? প্রথমত, নিজের বিশ্বাসের বিপরীত মতামত পড়ার সাহস গড়ে তোলা। দ্বিতীয়ত, আবেগ জাগানো কোনো তথ্য দেখলে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া না জানানো। তৃতীয়ত, একাধিক স্বাধীন উৎস থেকে তথ্য যাচাই করা। এবং সর্বোপরি, নিজেকে একটি মৌলিক প্রশ্ন করা—এই তথ্যটি আমাকে কেন বিশ্বাস করাতে চাচ্ছে?
মিথ্যা প্রোপাগান্ডায় পড়া বুদ্ধির অভাবের পরিচয় নয়; এটি মানবিক দুর্বলতার ফল। কিন্তু সেই দুর্বলতাকে অস্বীকার করাই সবচেয়ে বড় বিপদ। একটি গণতান্ত্রিক ও সচেতন সমাজ গড়তে হলে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকেই আগে এই আত্মপ্রবঞ্চনা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—যখন শিক্ষিত সমাজ বিভ্রান্ত হয়, তখন পুরো সমাজই তার মূল্য চুকায়।
এবিএম জাকিরুল হক টিটন
সম্পাদক