খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২৬
অস্ট্রেলিয়ার দেখানো পথে এবার হাঁটতে চলেছে যুক্তরাজ্য। শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং অনলাইন বিপত্তি থেকে রক্ষা করতে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করার জোরালো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বুধবার (২২ জানুয়ারি, ২০২৬) ব্রিটিশ পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ ‘হাউস অব লর্ডস’ এই সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবের পক্ষে ঐতিহাসিক ভোট প্রদান করেছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বাধীন লেবার সরকারের ওপর আইনটি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য প্রবল চাপ তৈরি হয়েছে।
কনজারভেটিভ আইনপ্রণেতা জন ন্যাশের উত্থাপিত এই সংশোধনী প্রস্তাবটি হাউস অব লর্ডসে ২৬১-১৫০ ভোটে গৃহীত হয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি এবং লিবারাল ডেমোক্র্যাটদের অনেক সদস্যও দলীয় অবস্থানের বাইরে গিয়ে এই বিলটিকে সমর্থন করেছেন। জন ন্যাশ এই বিজয়কে শিশুদের ভবিষ্যতের জয় হিসেবে অভিহিত করে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একটি প্রজন্মের যে অপূরণীয় ক্ষতি করছে, এই ভোটের মাধ্যমে তা প্রতিরোধের প্রক্রিয়া শুরু হলো।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সংক্রান্ত নীতি:
| দেশ | গৃহীত পদক্ষেপ/বর্তমান অবস্থা | বয়সের সীমা | মূল লক্ষ্য |
| অস্ট্রেলিয়া | গত ১০ ডিসেম্বর থেকে পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর। | ১৬ বছরের কম | সাইবার বুলিং ও আসক্তি রোধ। |
| যুক্তরাজ্য | হাউস অব লর্ডসে বিল পাস, কমন্সে আলোচনার অপেক্ষায়। | ১৬ বছরের কম | অনলাইন সুরক্ষা ও মানসিক স্বাস্থ্য। |
| ফ্রান্স | বিশেষ অ্যাপ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর তদারকি। | ১৫ বছরের কম | তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা। |
| যুক্তরাষ্ট্র | কিছু অঙ্গরাজ্যে মা-বাবার অনুমতি বাধ্যতামূলক। | ১৩-১৬ বছর | বাণিজ্যিক শোষণ থেকে রক্ষা। |
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার শিশুদের সুরক্ষায় তাঁর সরকারের দৃঢ় প্রতিশ্রুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। গত সোমবার এক বিবৃতিতে তিনি জানান, শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার কোনো বিকল্পই বাদ দিচ্ছে না। তবে আইনটি চূড়ান্তভাবে প্রণয়নের আগে আগামী গ্রীষ্মকালীন পরামর্শ ও পর্যালোচনার ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করতে চায় ডাউনিং স্ট্রিট। যদিও হাউস অব কমন্সের ৬০ জনেরও বেশি লেবার এমপি সরাসরি নিষেধাজ্ঞার পক্ষে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছেন।
যুক্তরাজ্যের সাধারণ জনগণের মধ্যে এই নিষেধাজ্ঞার পক্ষে ব্যাপক জনমত লক্ষ্য করা গেছে। সাম্প্রতিক এক ‘ইউগভ’ জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৭৪ শতাংশ নাগরিক শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার পক্ষে মত দিয়েছেন। কেবল অভিভাবক নন, ব্রিটিশ অভিনেতা হিউ গ্রান্টসহ অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি সরকারের প্রতি এই প্রস্তাব সমর্থনের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর অ্যালগরিদমের ফাঁদ থেকে শিশুদের রক্ষা করা কেবল মা-বাবার একার পক্ষে সম্ভব নয়; এর জন্য রাষ্ট্রীয় আইনের কঠোর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
যুক্তরাজ্যে ইতিমধ্যে ‘অনলাইন সেফটি অ্যাক্ট’ বা অনলাইন সুরক্ষা আইন বিদ্যমান রয়েছে, যা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে শিশুদের জন্য ক্ষতিকর বিষয়বস্তু নিয়ন্ত্রণে বাধ্য করে। তবে নতুন এই প্রস্তাবিত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে কোম্পানিগুলোকে ব্যবহারকারীর বয়স যাচাই করার ক্ষেত্রে আরও কঠোর ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। যদি কোনো প্ল্যাটফর্ম আইন লঙ্ঘন করে ১৬ বছরের কম বয়সীদের অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ দেয়, তবে তাদের বিশাল অংকের জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে।
শিশুদের শৈশবকে ডিজিটাল আসক্তি ও সাইবার অপরাধ থেকে মুক্ত করতে যুক্তরাজ্যের এই উদ্যোগ বিশ্বজুড়ে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। হাউস অব লর্ডসে পাস হওয়া বিলটি এখন নিম্নকক্ষ হাউস অব কমন্সে যাবে। সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের সমর্থন পেলে যুক্তরাজ্য হবে বিশ্বের দ্বিতীয় প্রধান দেশ, যারা আইন করে শিশুদের জন্য ভার্চুয়াল জগতের এই উন্মুক্ত দুয়ার বন্ধ করে দেবে। এটি কেবল একটি আইনি পরিবর্তন নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক বিকাশে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।