শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটে (এসএলসি) চলমান প্রশাসনিক সংকট নিরসনে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে দেশটির সরকার। দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা এবং অদক্ষতার অভিযোগে শাম্মি সিলভার নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হওয়ার পর একটি শক্তিশালী ‘ট্রান্সফরমেশন কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। ৯ সদস্য বিশিষ্ট এই কমিটিতে যুক্ত করা হয়েছে কিংবদন্তি ক্রিকেটার কুমার সাঙ্গাকারাকে, যা লঙ্কান ক্রিকেটে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
পটভূমি ও পদত্যাগ
শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। গত বুধবার সরকারের বিশেষ নির্দেশনার পর শাম্মি সিলভা ও তার নেতৃত্বাধীন পুরো বোর্ড পদত্যাগ করে। এই শূন্যতা পূরণে এবং ক্রিকেট কাঠামোকে ঢেলে সাজাতে দেশটির সরকার তাৎক্ষণিকভাবে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করে। কমিটির মূল লক্ষ্য হলো প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শ্রীলঙ্কার হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করা।
কমিটির গঠন ও নেতৃত্ব
নতুন গঠিত এই কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে সাবেক সংসদ সদস্য এবং বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এরান বিক্রমারত্নেকে। তিনি শ্রীলঙ্কার প্রধান বিরোধী দল সামাগি জন বালাওয়েগয়ার (এসজেবি) প্রভাবশালী নেতা হওয়া সত্ত্বেও ক্রিকেট সংস্কারের মহৎ উদ্দেশ্যে রাজনৈতিক পরিচয় থেকে দূরে থেকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করার অঙ্গীকার করেছেন।
কমিটিতে ক্রিকেটীয় মেধা এবং আইনি ও করপোরেট পেশাদারত্বের সুষম সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। কুমার সাঙ্গাকারা ছাড়াও সাবেক দুই তারকা ক্রিকেটার রোশান মহানামা ও সিদাথ ওয়েত্তিমুনিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া আইনি জটিলতা নিরসন এবং নতুন গঠনতন্ত্র প্রণয়নের জন্য রাখা হয়েছে প্রথিতযশা আইনজীবীদের।
ট্রান্সফরমেশন কমিটির প্রধান সদস্যগণের তালিকা:
| সদস্যের নাম | ক্ষেত্র/বিশেষজ্ঞতা | বিশেষ পরিচিতি |
| এরান বিক্রমারত্নে | রাজনীতি ও ব্যবসা | কমিটির চেয়ারম্যান ও সাবেক সংসদ সদস্য |
| কুমার সাঙ্গাকারা | ক্রিকেট | সাবেক জাতীয় অধিনায়ক ও আইসিসি হল অব ফেমার |
| রোশান মহানামা | ক্রিকেট | সাবেক ক্রিকেটার ও আইসিসি ম্যাচ রেফারি |
| সিদাথ ওয়েত্তিমুনি | ক্রিকেট | শ্রীলঙ্কার সাবেক টেস্ট ওপেনার |
| দিনাল ফিলিপস | আইন | জ্যেষ্ঠ আইনজীবী (গঠনতন্ত্র সংস্কার বিশেষজ্ঞ) |
| উপুল কুমারাপেরুমা | আইন | জ্যেষ্ঠ আইনজীবী (আইনি পরিকাঠামো বিশেষজ্ঞ) |
সংস্কারের দুটি প্রধান লক্ষ্য
কমিটির দায়িত্ব গ্রহণের পর চেয়ারম্যান এরান বিক্রমারত্নে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে দুটি সুনির্দিষ্ট অগ্রাধিকারের কথা তুলে ধরেন।
১. শাসন কাঠামোর সংস্কার ও নতুন গঠনতন্ত্র: শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটের বর্তমান গঠনতন্ত্রকে অকেজো এবং ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে যে, বিদ্যমান নিয়মের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে অকার্যকর ক্রিকেট ক্লাবগুলো অতিরিক্ত ভোট প্রদানের ক্ষমতা পায়, যা দুর্নীতি ও অযোগ্য নেতৃত্বের পথ প্রশস্ত করে। কমিটির প্রথম কাজ হবে একটি আধুনিক ও শক্তিশালী গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করা, যা স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে।
২. মাঠের খেলায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন: দ্বিতীয় লক্ষ্য হলো জাতীয় দলগুলোর পারফরম্যান্স উন্নয়নে কাজ করা। কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিশ্বমানের অবকাঠামো তৈরি এবং খেলোয়াড়দের জন্য একটি কার্যকর ‘ইনসেনটিভ মডেল’ চালু করা হবে। এর মাধ্যমে খেলোয়াড়রা যাতে আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষস্থানে ফিরতে পারে, তার জন্য প্রয়োজনীয় পেশাদার পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।
আইসিসি ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের শঙ্কা
অতীতের রেকর্ড অনুযায়ী, শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটে সরকারি হস্তক্ষেপের কারণে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) কঠোর অবস্থান নিয়েছিল। বিশেষ করে ২০২৩ সালে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগে শ্রীলঙ্কার আইসিসি সদস্যপদ স্থগিত করা হয়েছিল। তবে এবারের কমিটির প্রধান বিক্রমারত্নে আশ্বস্ত করেছেন যে, তারা আইসিসির নিয়মকানুনের সঙ্গে পূর্ণ সামঞ্জস্য বজায় রেখে কাজ করবেন। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে সম্পূর্ণ পেশাদারি ও স্বচ্ছতার সাথে এই রূপান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। তবে এই কমিটির নির্দিষ্ট মেয়াদকাল কতদিন হবে, সে সম্পর্কে সরকারি আদেশে এখনও স্পষ্ট কিছু উল্লেখ করা হয়নি।



