খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 16শে আশ্বিন ১৪৩২ | ১ই অক্টোবর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
পশ্চিম এশিয়ায় অস্থিরতা যখন তুঙ্গে, ঠিক তখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে ইরাক। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরাসরি ইরাকের প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোকে হুমকি দেন। তাঁর এই বার্তা শুধু কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়ায়নি, বরং নতুন প্রশ্নও তুলেছে—ইসরায়েলের প্রকৃত লক্ষ্য কী, আর এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে কী পরিবর্তন আসতে পারে?
এই হুমকি আসে এমন সময়ে, যখন ইরাকের ভেতরে প্রতিরোধ গোষ্ঠীর অস্ত্র রাখার বৈধতা নিয়ে বিতর্ক চলছে। সামনে নির্বাচন, তার ওপর সিরিয়া সীমান্ত থেকে আসা নিরাপত্তা হুমকিও অব্যাহত। সব মিলিয়ে ইরাক এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে—বাগদাদ কি ইসরায়েলি যুদ্ধের নতুন ফ্রন্ট হবে, নাকি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ভঙ্গুর কিন্তু কার্যকর ভূমিকা বজায় রাখবে?
জাতিসংঘে নেতানিয়াহুর বক্তব্যে ইরাকের প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে খোলাখুলি হুমকি শোনা যায়। এর জবাবে ইরাকের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফুয়াদ হুসেইন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, কোনো ইরাকি নাগরিকের ওপর হামলা মানেই পুরো জাতির ওপর হামলা। ইরাকি রাজনীতিক ও বিশ্লেষকেরা নেতানিয়াহুর এই বার্তাকে দুর্বল অবস্থার বহিঃপ্রকাশ বলেই মনে করেন। কারও মতে, গাজায় স্পষ্ট বিজয় অর্জনে ব্যর্থ হয়ে এবং বন্দী মুক্ত করতে না পারায় নেতানিয়াহু এখন মনোযোগ অন্য দিকে সরাতে চাইছেন।
কিছু বিশ্লেষক বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা সমর্থন না থাকলে নেতানিয়াহু এতদূর যেতে পারতেন না। আবার অন্যরা মনে করছেন, ইসরায়েলের হুমকি যতটা উচ্চকণ্ঠে শোনা যাচ্ছে, বাস্তবে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা ততটাই কম। কারণ, ইরাকে আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহ ও বৈশ্বিক বিনিয়োগের স্বার্থ জড়িত। বাগদাদ, প্রতিরোধ গোষ্ঠী ও ওয়াশিংটনের মধ্যে একটি কার্যকর সমঝোতাও এ স্থিতিশীলতা বজায় রাখছে।
তবু ঝুঁকি কম নয়। প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোকে নিরস্ত্র করা দীর্ঘদিন ধরেই ইরাকি রাজনীতির কেন্দ্রীয় ইস্যু। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র একাধিক গোষ্ঠীকে সন্ত্রাসী তালিকায় যুক্ত করেছে, যা আঞ্চলিক অক্ষকে দুর্বল করার কৌশলেরই অংশ। কিন্তু বিশ্লেষকেরা মনে করেন, গোষ্ঠী নিরস্ত্রীকরণের দাবি বাস্তবে কার্যকর নয়। কারণ, প্রতিরোধ শক্তি এখন সমাজের গভীরে প্রোথিত এবং জাতীয় মর্যাদা রক্ষার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
এদিকে সিরিয়া সীমান্ত থেকেও নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সীমান্ত ঘেঁষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি সংঘাত ছড়িয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে। একই সঙ্গে উত্তর-পূর্ব সিরিয়ার আল-হাওল শিবিরে হাজার হাজার সাবেক আইএস সদস্যের উপস্থিতি ইরাকের নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি হয়ে আছে। মার্কিন সেন্টকমও এ শিবির ভাঙার আহ্বান জানিয়েছে, যদিও বিদেশি নাগরিক ফেরাতে রাজনৈতিক অনিচ্ছা বড় বাধা হয়ে আছে।
সব মিলিয়ে ইরাক এখন বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখে। একদিকে ভেতরে প্রতিরোধ গোষ্ঠী নিরস্ত্রীকরণের বিতর্ক, অন্যদিকে ইসরায়েলের সরাসরি হুমকি ও সীমান্তপারের অনিশ্চয়তা। বাগদাদ আপাতত কূটনৈতিক ভারসাম্যের নীতি মেনে চলছে—একদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতা করছে, অন্যদিকে কৌশলগত স্বাধীনতাও ধরে রাখছে।
প্রশ্ন হলো, ইরাক কি নতুন করে আঞ্চলিক সংঘাতের ময়দান হয়ে উঠবে, নাকি নাজুক স্থিতিশীলতা আঁকড়ে মধ্যপ্রাচ্যে ভারসাম্যের ভূমিকা রাখবে? উত্তরটা নির্ভর করছে শুধু বাগদাদের সিদ্ধান্তে নয়, বরং ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর হিসাব-নিকাশের ওপর।
খবরওয়ালা/এন