বগুড়া প্রতিনিধি
প্রকাশ: শনিবার, ৩ মে ২০২৫
বাংলাদেশের সিরামিক শিল্পের পথচলার সূচনালগ্নের এক গুরুত্বপূর্ণ নাম তাজমা সিরামিক। বগুড়ার মাটি আর শ্রমিকদের ঘামে-ঘষায় গড়ে ওঠা এই কারখানা ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম সিরামিক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। ১৯৫৮ সালে যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি—যা পরবর্তীকালে হয়ে ওঠে একটি শিল্প-আইকন।
তাজমার পেছনে যার হাতছানি, তিনি আবদুল জব্বার, নওগাঁর রানীনগরের খাজুরিয়াপাড়া গ্রামের এক সংগ্রামী মানুষ। অভাবের তাড়নায় চল্লিশের দশকে বগুড়ায় পাড়ি জমান তিনি। পড়াশোনার সুযোগ না পেলেও, জীবনের বাস্তবতা তাঁকে ঠেলে দেয় শ্রমিক হিসেবে ভাণ্ডারি বিড়ি ফ্যাক্টরিতে। কিন্তু এখানেই থেমে থাকেননি। ভাইদের সহায়তায় শুরু করেন নিজের বিড়ির ব্যবসা—যার ‘কল্যাণ বিড়ি’ ও ‘পাক বিড়ি’ অল্প সময়েই পরিচিতি পায় উত্তরবঙ্গে।
বিড়ি ব্যবসার সাফল্য তাকে অনুপ্রাণিত করে বড় স্বপ্ন দেখতে। নিজের লাভের অর্থ দিয়ে গড়ে তোলেন দেশের প্রথম সিরামিক কারখানা—‘তাজমা সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’। চার ভাইয়ের নামের প্রথম অক্ষর নিয়ে প্রতিষ্ঠিত এই কোম্পানির প্রথম ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন জব্বার নিজেই।
তাজমা সিরামিকের তৈরি বাসনকোসন, কাপ-পিরিচ, ফুলদানি এক সময় ছড়িয়ে পড়ে তৎকালীন পাকিস্তানের আনাচে-কানাচে। কিন্তু সময় বদলায়। ফার্নেস অয়েল সংকটের কারণে ২০০১ সালে কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ আট বছরের নীরবতা শেষে ২০০৯ সালে গ্যাস সংযোগ পাওয়ার পর আবারও প্রাণ ফিরে পায় প্রতিষ্ঠানটি। চীনের কারিগরি সহায়তায় শুরু হয় নতুন পথচলা। আধুনিক ডিজাইন ও প্রযুক্তি যুক্ত হয়ে বাজারে ফিরে আসে তাজমার পণ্য।
বর্তমানে তাজমা তৈরি করে প্রায় ৬০ ধরনের সিরামিক পণ্য—প্লেট, কাপ, বাটি, মগ, গ্লাস, জগ, ফুলদানি, শোপিস ইত্যাদি। প্রতিবছর প্রায় ১২ কোটি টাকার বাজার তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটি, যা স্থানীয় অর্থনীতির পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতেও রাখছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। এখানে প্রায় ২৫০ কর্মী কাজ করেন, যাদের বেশিরভাগই নারী—যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
তবে সাফল্যের গল্পের মাঝেও রয়েছে বাস্তবতার কঠিন ছায়া। তাজমার বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শরিফুজ্জামান বলেন,“এখন প্রতিষ্ঠানটি অস্তিত্ব সংকটে। চলতি মূলধনের ঘাটতি, আধুনিকায়নের অভাব এবং গ্যাস ব্যবহারে পূর্ণ সক্ষমতা না থাকায় নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। তবে আমরা চেষ্টা করছি—যেভাবেই হোক, এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানকে বাঁচিয়ে রাখতে।”
বিশ্ব অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে ডলার সংকট ও টাকার অবমূল্যায়ন দেশীয় শিল্পের মতোই তাজমাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। প্রযুক্তি হালনাগাদ না হওয়ায় উৎপাদন খরচ বাড়ছে, প্রতিযোগিতায় টিকতে হচ্ছে সংগ্রামের মাধ্যমে। তবুও ঐতিহ্যের দায়ে, গুণগত মান আর শ্রমিকদের প্রতি দায়িত্ববোধে তাজমা সিরামিক আজও দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে।
তাজমা কর্তৃপক্ষের দাবি, সরকার যদি কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ছাড়, গ্যাস সরবরাহে নিশ্চয়তা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেয়, তাহলে তাজমা আরও বড় পরিসরে ফিরতে পারবে।
বর্তমানে দেশে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার সিরামিক বাজার। বড় বড় কোম্পানির সঙ্গে হয়তো তাজমা দাপটের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারছে না, কিন্তু এর দীর্ঘ ইতিহাস, শিকড়গাঁথা পরিচয় এবং শ্রমিকনির্ভর উৎপাদন কাঠামো একে এখনো দৃঢ় ভিতের ওপর দাঁড় করিয়ে রেখেছে।
খবরওয়ালা/এমবি