খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬
জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সরঞ্জাম কেনাকাটায় আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। সোমবার (২০ এপ্রিল, ২০২৬) সংসদ সচিবালয়ের গণসংযোগ বিভাগ থেকে প্রেরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। তদন্ত কার্যক্রম চলাকালীন এবং চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা না দেওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ক্রয়ের বিপরীতে কোনো অর্থ বা বিল পরিশোধ না করার কঠোর নির্দেশনা প্রদান করেছে কর্তৃপক্ষ।
সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকা এবং বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে ‘সংসদের কেনাকাটায় হরিলুট’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটিতে সংসদ সচিবালয়ের বিভিন্ন ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম ক্রয়ের ক্ষেত্রে বাজারদরের তুলনায় অস্বাভাবিক ব্যয় এবং প্রক্রিয়গত অসংগতির তথ্য উঠে আসে। প্রকাশিত সংবাদের এই গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে সংসদ কর্তৃপক্ষ তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে।
সংসদ সচিবালয়ের পরিচালক (গণসংযোগ) মো. মনির হোসেন স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় যে, প্রকাশিত সংবাদের সত্যতা যাচাই এবং দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে অবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কমিটির রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে কোনো প্রকার অর্থ প্রদান করা হবে না।
তদন্তের মূল ভিত্তি হচ্ছে সরবরাহকৃত পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্য এবং দরপত্রের শর্ত লঙ্ঘন। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ত্রয়োদশ সংসদের কার্যক্রম শুরুর পর এটিই ছিল সংসদ সচিবালয়ের প্রথম বড় ধরনের কেনাকাটা। উল্লেখ্য যে, গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। এর অল্প সময়ের ব্যবধানে গত ২৫ মার্চ ‘সেফ ট্রেডার্স’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানকে সরঞ্জাম সরবরাহের কার্যাদেশ প্রদান করা হয়।
ক্রয়কৃত সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে পেশাদার ক্যামেরা, লেন্স, মেমোরি কার্ড, ব্যাটারি ও ফ্ল্যাশসহ বিভিন্ন কারিগরি যন্ত্রাংশ। প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে যে, যে সরঞ্জামগুলোর প্রকৃত বাজারমূল্য ২০ লাখ টাকার নিচে, সেগুলোর জন্য মোট ৫৮ লাখ ৪৪ হাজার ১৩০ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ বাজারদরের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি অর্থ অপচয়ের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।
তদন্তের আওতায় আসা মূল অসংগতিগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
| অসংগতির বিষয় | বিস্তারিত বিবরণ |
| মূল্য পার্থক্য | বাজারদর ২০ লাখ টাকার কম হলেও বিল করা হয়েছে ৫৮.৪৪ লাখ টাকা। |
| ব্র্যান্ড পরিবর্তন | দরপত্রে উল্লিখিত ব্র্যান্ডের পরিবর্তে অন্য ব্র্যান্ডের পণ্য সরবরাহ। |
| সরবরাহের সময়সীমা | ৩০ দিনের সময় থাকলেও মাত্র ১৯ দিনের মধ্যে তড়িঘড়ি করে মালামাল গ্রহণ। |
| ব্যক্তিগত সংশ্লিষ্টতা | সাবেক সচিব কানিজ মাওলার বিরুদ্ধে অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগ। |
| কার্যাদেশ ও সরবরাহ | কার্যাদেশ প্রদান ২৫ মার্চ এবং মালামাল বুঝে নেওয়া হয় ১৫ এপ্রিল। |
এই অনিয়মের বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর সংসদ অধিবেশনে ব্যাপক ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে। সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রীয় অর্থের এই অপচয়ের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তুলেছেন। প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই ক্রয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংসদ সচিবালয়ের সাবেক সচিব কানিজ মাওলা সরাসরি যুক্ত ছিলেন।
নতুন সরকার গঠনের পর প্রথম এই কেনাকাটাতেই এমন দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় প্রশাসন অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছে। তদন্ত কমিটি এখন খতিয়ে দেখবে কীভাবে বাজার যাচাই না করে কার্যাদেশ দেওয়া হলো এবং কারিগরি স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী সঠিক পণ্য সরবরাহ করা হয়েছে কি না। তদন্ত রিপোর্ট প্রাপ্তির পর জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পাওনা পরিশোধের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।