খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫
সুনামগঞ্জ শহরের উকিলপাড়ায় বসবাস করতেন হবিগঞ্জের নবীপুর গ্রামের প্রণয় দাশের স্ত্রী আঁখি চৌধুরী ও তাদের কন্যা প্রথমা চৌধুরী। আজ আর এই পরিবারে কেউ জীবিত নেই। সবাই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন।
একসময় তিন সদস্যের সুখি পরিবার থাকলেও দুর্ঘটনা কেড়ে নিয়েছে একজনের পর আরেকজনকে। দুই বছর আগে প্রাণঘাতী সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় পরিবারের কর্তা প্রণয় দাশের। সেই আঘাত কাটিয়ে ওঠার আগেই শুক্রবার সকালে আরেকটি দুর্ঘটনায় নিভে যায় পরিবারের অবশিষ্ট আলো। একই ঘটনায় নিহত হন প্রণয়ের স্ত্রী আবাদিত কেশবা (৪০) এবং একমাত্র কন্যা ৮ম শ্রেণির ছাত্রী প্রথমা চৌধুরী (১৩)। প্রথমা সতীশ চন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। এদিকে তাদের সঙ্গে প্রাণ হারান সিএনজি চালক সজল ঘোষ (৫০)। আজমিরিগঞ্জের জলসুখা গ্রামের সজল পরিবার নিয়ে সুনামগঞ্জের নবীনগরে থাকতেন এবং সিএনজি দিয়ে যাত্রী পরিবহন করতেন। প্রণয়ের পরিবারকে হবিগঞ্জে নিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। সজল ও প্রণয়ের পরিবার উভয়ই ইসকন অনুসারী এবং পূর্বপরিচিত ছিলেন। সজলের মৃত্যুতেও তার পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোক।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তিনি। মৃত্যুর পর স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, শুক্রবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে শান্তিগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের বাঘেরকোনা গ্রামে সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কে ঘটে ভয়াবহ এ দুর্ঘটনা। সিলেট থেকে সুনামগঞ্জগামী একটি দ্রুতগামী ট্রাক বিপরীত দিক থেকে আসা সিএনজিকে সোজাসুজি ধাক্কা দিলে সিএনজি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই কেশবা ও সিএনজি চালক নিহত হন। গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। শান্তিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ইকবাল হাসান জানান, হাসপাতালে আনার আগেই তিনজন মারা গিয়েছিলেন। আমরা কেবল মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছি। স্থানীয় বাসিন্দা শাহীন মিয়া জানান, হঠাৎ বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। গিয়ে দেখি ট্রাকটি পানিতে পড়ে আছে, সিএনজি পিষে গেছে, রাস্তায় মরদেহ ছড়িয়ে রয়েছে।
নিহতদের আত্মীয় গোবিন্দ কুমার দাশ বলেন, দুই বছর আগে প্রণয় দাশকে হারিয়েছিলাম। আজ তার স্ত্রী ও মেয়েকে হারালাম। এখন এই পরিবারে আর কেউ বেঁচে নেই। দুর্ঘটনার পর ক্ষুব্ধ জনতা ঘাতক ট্রাকচালক পারভেজ আহমদকে (৩০) আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। তিনি সিলেটের বাদামবাগিছার বাসিন্দা ও দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া ইউনিয়নের মৃত জালাল উদ্দিনের ছেলে। উকিলপাড়ার বাসিন্দা শুভ জানান, গতকাল যে বাড়িতে ছিল হাসি-আনন্দ, আজ সেখানে কেবল শোকের মাতম। শিক্ষক বাকী বিল্লা আখঞ্জি বলেন, শুক্রবার রাত ১১টার দিকে প্রথমা মেসেজ দিয়ে জানায়, স্যার সকালে হবিগঞ্জের বাড়ি যাচ্ছি, কয়েকদিন প্রাইভেটে আসতে পারবো না। কিন্তু তার হবিগঞ্জ যাওয়া আর হলো না, সে চলে গেল না ফেরার দেশে। তার বাবা নেই, মা বলতেন—‘স্যার, প্রথমার দায়িত্ব আপনার কাছে।’ সুনামগঞ্জ জজ কোর্টের আইনজীবী ফরহাদ উদ্দিন ফারুক বলেন, সুনামগঞ্জ-সিলেট মহাসড়ক এখন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। সরু ও বাঁকানো এই সড়কে ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলছে। এখনই ব্যবস্থা না নিলে আরও অনেক পরিবার ধ্বংস হয়ে যাবে। শান্তিগঞ্জ থানার ওসি আবদুল আহাদ বলেন, ঘাতক ট্রাকচালককে আটক করা হয়েছে, ট্রাক ও সিএনজি জব্দ করা হয়েছে, আইনি প্রক্রিয়া চলছে।
খবরওয়ালা/টিএসএন