নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৯ মে ২০২৫
ঢাকার অপরাধ ইতিহাসে কিছু নাম কেবল ব্যক্তি নয়—একটি সময়, একটি আতঙ্কের নাম। তেমনই এক নাম সুব্রত বাইন। একসময় মোহাম্মদপুরের রাস্তায় হেঁটে বেড়ানো এই যুবক কীভাবে ঢাকার অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসীতে পরিণত হলেন, তা কোনো দৈব ঘটনা নয়। এটি ছিল একটি ধারাবাহিক সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।
ছাত্ররাজনীতি থেকে অপরাধজগতে
সুভ্রত বাইনের উত্থান শুরু ৯০-এর দশকে। একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠনের হয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। প্রথমদিকে তার দায়িত্ব ছিল প্রতিপক্ষ দমনে ক্যাডার হিসেবে অংশ নেওয়া। দ্রুতই সে হয়ে ওঠে এলাকার ‘অপারেটর’—যার নির্দেশ মানা মানে বাঁচা, অবাধ্যতা মানেই শাস্তি।
রাজনীতির ক্ষমতা, পৃষ্ঠপোষকতা আর আগ্নেয়াস্ত্র—এই তিনের মিশ্রণে সুভ্রতের হাতে তৈরি হয় এক ভয়ঙ্কর সাম্রাজ্য।
সেভেন স্টার গ্রুপ: টেররের ব্র্যান্ড
২০০০ সালের দিকে তিনি গঠন করেন ‘সেভেন স্টার গ্রুপ’ নামের এক সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী বাহিনী। মোহাম্মদপুর, আদাবর, শ্যামলী, ধানমন্ডি—এই এলাকাগুলোতে চাঁদাবাজি, জমি দখল, হত্যা, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ছিল তাদের প্রধান কার্যক্রম। পুলিশ ও রাজনীতিকদের ম্যানেজ করেই চলত তাদের দাপট।
তার বিরুদ্ধে তখন থেকে শুরু হয় একের পর এক মামলা—অস্ত্র, খুন, চাঁদাবাজি, অপহরণসহ প্রায় ৪০টির বেশি মামলা হয় তার বিরুদ্ধে। কিন্তু প্রতিবারই কিছুদিন পর জামিনে বেরিয়ে আবারও ফিরে আসতেন অপরাধের মঞ্চে।
পালিয়ে যাওয়া ও আন্তর্জাতিক চক্র
২০০৪ সালে র্যাব গঠনের পর তার বিরুদ্ধে বড় অভিযান শুরু হয়। সেই সময় তিনি দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান। কলকাতা, ত্রিপুরা, আসামে ছদ্মনামে থেকে যান গোপনে। খবরে এসেছে, তিনি তখনো আন্তর্জাতিক অস্ত্রচোরাচালান, মাদক পাচার ও একাধিক সন্ত্রাসী চক্রের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।
২০১২ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে তিনি গ্রেপ্তার হন, বর্তমানে সেখানকার একটি জেলে বন্দি। বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলেও ভারতের আইনি প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক সমীকরণে তা বিলম্বিত হচ্ছে।
রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও অপরাধের অনুমোদন
সুভ্রতের এই উত্থান আর বেঁচে থাকার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে রাজনীতির আশ্রয়-প্রশ্রয়। তিনি কোনো একক ব্যক্তি নন—বরং সেই রাজনীতি-প্রশাসন-পুলিশ চক্রের প্রতিফলন, যেখানে অপরাধ আর প্রভাব একাকার হয়ে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, “সুভ্রত বাইন কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং তিনি বিচারহীনতার ধারাবাহিক ফল।” যারা তাঁকে এক সময় ব্যবহার করেছেন, পরে রাজনৈতিক হাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে পরিত্যাগও করেছেন। কিন্তু ততদিনে তিনি হয়ে উঠেছেন অপরাধজগতের এক কিংবদন্তি—ভয়ের, দুঃস্বপ্নের এবং দুঃশাসনের।
খবরওয়ালা/ এমএজেড