ড. আশরাফ উদ্দিন আহমেদ
প্রকাশ: শনিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫
এমন শিরোনামে নিবন্ধ লিখতে হলে সময়ের ব্যবধানকে উপজীব্য করে তুলনামূলক আলোচনা শ্রেয়। সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করতে হলে পদ্ধতিগতভাবে এতে নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ আনয়ন জরুরি। তারপরও সামাজিক ইস্যুতে ‘সাবজেক্টিভিটি’ থাকবেই। সচেতন চেষ্টায় হয়তো কিছুটা কমানো যায়। লেখাটির পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতা ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ রইল।
সাত বছর পূর্বে ‘প্রাচুর্যের মাঝে দারিদ্র’ শীর্ষক একটি লেখা লিখেছিলাম, যা পরবর্তীতে আমার লেখা সামাজিক স্তরবিন্যাস ও রাজনৈতিক মেরুকরণ পুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে (প্রকাশক: ভূর্জপত্র, মার্চ ২০২২; অনলাইন পরিবেশক: rokomari.com)।
লেখাটিতে উপযুক্ত তথ্যাদি কোট করে বলা হয়েছিল যে, বিত্তবানদের দেশ আমেরিকায় ৫ শতাংশ পরিবারের কব্জায় দেশটির মোট সম্পদের দুই-তৃতীয়াংশ (মূলত সরকার-নিয়ন্ত্রিত সিকিউরিটিস এবং রিয়েল এস্টেট প্রপার্টিজ)। সেটি ছিল প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময়ের, যিনি এহেন পর্বতসম বৈষম্যজনিত কারণে যে দারিদ্র অবস্থা থেকে উত্তরণের একটি উপায় হিসেবে মার্চ ২০২১-এ American Rescue Plan (ARP) অ্যাক্টটিকে আইনে রূপান্তরিত করেছিলেন। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। প্যান্ডেমিক যখন লকডাউন পর্যায়ে, সে সময় এবং তার অব্যবহিত পরে ৮ মিলিয়ন লোক দারিদ্রপ্রপীড়িত হয়ে পড়ে। সীমাহীন বৈভব, বিত্তের দেশ আমেরিকায় প্রচুর লোক দারিদ্রের মধ্যে কালাতিপাত করে।
প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার দ্বিতীয় টার্মে বিভিন্ন অর্থনৈতিক-সামাজিক কর্মসূচির ফলশ্রুতিতে দারিদ্র সীমা ১১.১ শতাংশে নেমে এসেছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আমলে প্যান্ডেমিক বিভীষিকা তা ব্যাহত করে; সে সময় ৮ মিলিয়ন মানুষ দারিদ্র সীমার নিচে চলে আসে। প্যান্ডেমিকের পূর্বে ৪৩.৫ মিলিয়ন আমেরিকান দারিদ্র সীমার নিচে ছিল। প্যান্ডেমিক সময়ে বেড়ে তা ৫৫ মিলিয়নে পৌঁছে যায় বলে মনে করা হয় (দেখুন, উইকিপিডিয়া Poverty in America Today এবং আহমেদ, পূর্বোক্ত সামাজিক স্তরবিন্যাস ও রাজনৈতিক মেরুকরণ, পৃ. ৯৩)।
এরা কারা— এ প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, সম্প্রদায়ভিত্তিক বা বিভিন্ন এথনিক গ্রুপের মধ্যে যথাক্রমে ২৫.৪, ২০.৮, এবং ১৭.৬ শতাংশ করে নেটিভ আমেরিকান, কৃষ্ণাঙ্গ, এবং হিস্পানিক দারিদ্র সীমার নিচে বাস করে। হোয়াইট এবং এশিয়ানদের মধ্যে এ হার ১০.১ শতাংশ (দেখুন: আহমেদ, প্রাগুক্ত, পৃ. ৯৩)।
ধনতন্ত্র গাত্রাবরণের তেমন করেনা, যেমন করেনা গণতন্ত্রের মূল্যবোধ, নির্যাসের। এতই নির্দয় ধনতন্ত্রের ধারক, বাহক, নেতা, চামুণ্ডাগণ।
টাইম ম্যাগাজিন বলে, সম্পদ-বিত্তের অসমতা গত চার দশকে এত বেড়েছে যে ২০১৮ সালে গরিব, স্বল্পবিত্ত শেতাঙ্গদের সংখ্যা ৬৬ মিলিয়ন থেকে অনেক বেড়ে গেছে। এ এক অন্যতম কারণ, যা ‘মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ স্লোগানকে ধারণ করতে তাদের প্রলুব্ধ করেছে। তবে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় টার্মের প্রায় ১১ মাস অতিক্রান্ত হলেও অবস্থার লক্ষণীয় উন্নতি হয়নি; বরং কৃষি উৎপাদন ক্ষেত্রে উৎপাদন ও রপ্তানি-বাণিজ্য নিম্নমুখী। দীর্ঘদিন অনভ্যাসের কারণে সাদা-কালো জনগোষ্ঠী কৃষিকাজকে অপছন্দ করে; পরিশ্রমের এ কাজ মেক্সিকান টেম্পোরারি শ্রমিকরাই করে। সাথে অন্য দেশের অবৈধ অভিবাসীরাও যোগ দেয়।
এদের যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগে বাধ্য করতে ট্রাম্পের কঠোর নীতি একদিকে যেমন দেশজাত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, একই কারণে সাময়িক খাদ্য উৎপাদন সমস্যাও সৃষ্টি করবে বলে ধারণা করার সংগত কারণ আছে। বিত্তবান ধনিক শ্রেণী কর-সুবিধাসহ নানাবিধ সুবিধা পেতে থাকবে। অন্যদিকে দরিদ্র, বিত্তহীন যারা মোট ভোটার সংখ্যার ৪০ শতাংশ, তারা ‘মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ পপুলিজম ধারণার মোহে সামাজিক-অর্থনৈতিক স্তরবিন্যাসের ঐতিহাসিক নিয়মে ক্রমাবনতির দিকে ধাবিত হতে থাকবে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ৭৭ মিলিয়ন ভোটারের ভোট পেতে তার নির্বাচনী ওয়াদার জটিল ধরণের কয়েক ক্ষেত্রে সফলকাম হয়েছেন সন্দেহাতীতভাবে।
দক্ষিণ সীমান্ত এখন সুরক্ষিত; অবৈধ অভিবাসন স্রোত গতি হারিয়েছে, এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সাময়িক বেকায়দা সত্ত্বেও শান্তি প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। তবে, দারিদ্র অব্যাহত গতিতে আগুয়ান। বিত্তবানদের সংখ্যা অর্থনীতির নিয়ম মেনে সুযোগ-সুবিধাসহ বাড়ছে—বলাইবাহুল্য।
খবরওয়ালাে/এমএজেড