সৈয়দ এনামুল তাজ
প্রকাশ: রবিবার, ৩০ মার্চ ২০২৫
১. ডেডবডি
সমগ্র জীবনজুড়ে সমস্ত চলে যাওয়াটুকু একরাশ। গোপনে মরে গন্ধ ছড়াচ্ছ প্রকট, ট্রেনের ছাদে ভ্রমণরত হঠাৎ বালকের ভাগ্য। নরসিংদী রেলস্টেশন; যেখানটায় ‘নরসিংদী’ নামের সাইনবোর্ড সেখানেই রাখা হয় ট্রেনে কাটা ডেডবডি আর সমস্ত স্টেশনজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ডোডো ও দোয়েলের কিচিরমিচির, লালা। লাশের শরীরে থাকে অতীত মানুষের গন্ধ ও স্মৃতি, কখনো কখনো মশারি ছেড়ে উঠে আসা ভাতঘুম। মানুষ জানে না কোথায় থামতে হয়, কোথায় থেমে গেলে জীবন ফিরে পায় গতি ও একটা রংবেরঙের শবযাত্রার মিছিল।
২. বেলাব
বেলাবর মাটিতে হাঁটতে পারি না, মায়া হয়, বেলাবরে তাই বুকে নিয়া ঘুরি, খুব ভারী। খানিক পরপর শরীরে চুমু খাই, ধুলায়। পুত্র অধিক প্রিয় না পতি, ময়ূরাক্ষী? দুজনই একজন হলে এই তবে কাটা যাবে মুণ্ডু নাকি উল্টে যাবে
দুনিয়া ভিখেরির নখের মতন? এই অবাধ্য ভাবনা মস্তিষ্কে স্থির, সব বয়সেই তার কেশপুষ্পের ভেতর পড়ে থাকে মন।
এই গোপন, মৎস্যগন্ধা কেশপুষ্পই এই অঞ্চলে ঝোপ, বেশ পুরোনো, সবুজ। এই ঝোপেই চারটা ছানাসহ এক মা ডাহুকীকে হেঁটে যেতে দেখেছি, দেখেছি মর্গরুমের পাশে কূট কী ফুলের মোহে জেগে আছে ডোম, কালী নদীর বাঁকে কেবল তোমাকেই দেখি না
৩. মর্গরুম
ব্রাহ্মণদী শহর থেকে বার্তা এনেছিলেন যে প্রবাসীরা, তারা পড়ে আছে, মৃত। এই দূর কুলিয়ারচরে আমি কার কাছে যাই? মধ্যাহ্নভোজের মতন মাধুর্যের ভিন্নতা নিয়ে কিশোরগঞ্জ শহরে সন্ধ্যারাতেই শিয়াল ডাকে, মানুষ অভ্যাসের লাশ, মর্গরুমে শুয়ে শুয়ে ভাবে এই বুঝি শিয়ালে খেল তাদের, লাশ মর্গে রেখে ফিরে যাচ্ছিল যারা। আর তারা? ফিরে যেতে যেতে শুনল ছুরিতে শাণ দেয়ার শব্দ, যা ঋতুগঞ্জের মেঘ কালো করে কোনো দিন বৃষ্টি নামাতে পারে না।
৪. দেহভঙ্গিমা
পালে হাওয়া লেগে দিক ভুলে বিদিকে যায় বেহুলার ভেলা
ক্রমশ দীর্ঘ হয় ভ্রমণ, তার স্তন বেয়ে নেমে আসে এই সন্ধ্যা
বন্য হাঁস ঘরে ফিরবে, বন্য শূকর ঘরে ফিরবে এই সব আশা
করি না—ঘুণপোকা খেয়ে যাবে শরীর, এই যা কামনা
পাখিসংগম শেষে চুপচাপ ঝরে যায় বৃক্ষের হলুদ পাতা
দারুকলমির ফাঁপা কাণ্ডের ভেতর কী সব কষ, ঝোপে গোখরোর বাসা—তার পাশে আমি প্রথম দেখেছি দৈহিক নির্জনতা, মৌচাক ছেড়ে যাওয়া মৌমাছির দেহ বিচ্ছেদে জ্বলে যাওয়া দেহভঙ্গিমা।
৫. মার্লে
ঝড় ও জঙ্গলের ভেতর হাঁটতে গিয়া এই অন্ধরাতে মনে হবে ধ্রুপদ মন্দির যেন, উত্থিত শিশ্নের দাপটে বাঁচে না; তাও নগ্নপ্রায় ধ্যানস্থ এক পুরোহিত—অসুস্থ মাকে দেখতে আসা ধর্মান্তরিত মধুসূদনকে তার পিতা বাড়িতে ঢুকতে না দেয়ার মতন অস্থিরতা ছড়াচ্ছে পবিত্র ধর্মগ্রন্থ হাতে।