খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২৬ নভেম্বর ২০২৫
আজ ২৬ নভেম্বর—অগ্নিদীপ্ত প্রতিভার অধিকারী, অকালপ্রয়াত কবি আবুল হাসানের মৃত্যুবার্ষিকী। আধুনিক বাংলা কবিতার আকাশে তিনি এমন এক নক্ষত্র, যা খুব অল্প সময়ের জন্য দেখা দিলেও আলো ছড়িয়ে গেছে প্রজন্মের পর প্রজন্মে। এই দিনে তাঁর স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর, বিনম্র শ্রদ্ধা।
কবি আবুল হাসান : অল্পায়ুর পরও দিগন্তজোড়া দীপ্তি
১৯৪৭ সালের ৪ আগস্ট গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ার বর্ণি গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন কবি। পৈতৃক নিবাস ছিল পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার ঝনঝনিয়া গ্রামে। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল আবুল হোসেন মিয়া। পিতা আলতাফ হোসেন মিয়া পুলিশ বিভাগে কর্মরত থাকায় এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় বারবার বদলি—শৈশবেই তাঁকে সমাজের বহুমাত্রিক বাস্তবতার মুখোমুখি করে। জীবনের নানা সংঘাত, অসমতা, ভালোবাসা আর বঞ্চনা তাঁর কবিতার ভেতর গাঢ় ছায়ার মতো জায়গা করে নিয়েছিল।
শিক্ষা ও সাংবাদিকতার দুনিয়ায় পদচারণা
ঢাকার আরমানিটোলা সরকারি বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৩ সালে এসএসসি ও বরিশালের বিএম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করার পর তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। কিন্তু পরীক্ষার আগেই মন টানল সংবাদজগতে—১৯৬৯ সালে তিনি যোগ দিলেন দৈনিক ইত্তেফাক-এ। পরবর্তীতে গণবাংলা ও দৈনিক জনপদ পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একজন প্রতিবেদক হিসেবে তাঁর চোখ ছিল তীক্ষ্ণ, সামাজিক সত্য অনুধাবনে ছিল বিস্ময়কর দক্ষতা—যা তাঁর কবিতাকে দিয়েছে অনন্য গভীরতা।
কাব্যধারায় নতুন জোয়ার
মাত্র এক দশকের মধ্যে আবুল হাসান বাংলা কবিতায় সৃষ্টি করেন নতুন ধারা—যেখানে মিশে আছে মৃত্যুচেতনা, নিঃসঙ্গতা, আত্মভোলা প্রেম, বেদনাবোধ, সমাজ–সংঘাত, যুদ্ধাহত মানুষের ব্যথা ও মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল আবেগ। আধুনিকতার নির্যাস, গভীর মানবিকতা এবং দহনময় সংবেদনশীলতা তাঁর কবিতাকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।
১৯৭০ সালে এশীয় কবিতা প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তিনি আলোচনায় উঠে আসেন। তাঁর কবিতায় ছিল এক আচ্ছন্নকারী শক্তি—যেন শব্দের মধ্যেই তিনি জীবনের ব্যথা আর সৌন্দর্যের রূপরেখা এঁকে যেতেন।
সাহিত্যকীর্তি
রাজা যায় রাজা আসে (১৯৭২), যে তুমি হরণ করো (১৯৭৪) এবং পৃথক পালঙ্ক (১৯৭৫) তাঁর তিনটি উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। এছাড়া ওরা কয়েকজন কাব্যনাট্য এবং আবুল হাসান গল্প–সংগ্রহ পাঠকদের মনে স্থায়ী আসন তৈরি করেছে।
পুরস্কার
মাত্র ২৮ বছরে জীবন থেমে গেলেও তিনি পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৭৫) এবং মৃত্যুর পর একুশে পদক (১৯৮২)—যা তাঁর গুরুত্ব ও প্রভাবের সাক্ষ্য বহন করে।
| বিভাগ | শিরোনাম | বছর |
|---|---|---|
| কবিতার বই | রাজা যায় রাজা আসে | ১৯৭২ |
| কবিতার বই | যে তুমি হরণ করো | ১৯৭৪ |
| কবিতার বই | পৃথক পালঙ্ক | ১৯৭৫ |
| গল্পগ্রন্থ | আবুল হাসান গল্প–সংগ্রহ | ১৯৯০ |
| কাব্যনাট্য | ওরা কয়েকজন | ১৯৮৮ |
| পুরস্কার | বাংলা একাডেমি পুরস্কার | ১৯৭৫ |
| পুরস্কার | একুশে পদক (মরণোত্তর) | ১৯৮২ |
অকালমৃত্যু—তবু চিরজাগরিত আলো
১৯৭৫ সালের ২৬ নভেম্বর, মাত্র ২৮ বছর বয়সে তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। তবে তাঁর কবিতা এখনও জীবন্ত—মানুষকে ভাবায়, আলোড়িত করে, সত্যের সামনে দাঁড় করায়। আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে একটাই প্রার্থনা—তিনি যেন শান্তিতে থাকেন, আর তাঁর কবিতার আলো আমাদের পথ দেখাতে থাকে চিরকাল।