খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২২ জুন ২০২৬
মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু মনীষীর আবির্ভাব ঘটেছে, যাঁদের জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও অবদান যুগ যুগ ধরে মানুষকে পথ দেখিয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে তেমনই এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন আবু আলী আল-হুসাইন ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে সিনা, যিনি বিশ্বজুড়ে ইবনে সিনা (Avicenna) নামেই সমধিক পরিচিত।
৯৮০ খ্রিস্টাব্দের ২২ আগস্ট তিনি জন্মগ্রহণ করেন। অল্প বয়স থেকেই তাঁর অসাধারণ মেধার পরিচয় প্রকাশ পেতে থাকে। মাত্র দশ বছর বয়সেই তিনি পবিত্র কোরআন শরীফ সম্পূর্ণ মুখস্থ করেন। এরপর জ্ঞানার্জনের অদম্য আগ্রহে তিনি ধর্মতত্ত্ব, ফিকাহ, তাফসির, গণিত, জ্যামিতি, দর্শন, ন্যায়শাস্ত্রসহ তৎকালীন জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রায় সব শাখায় অধ্যয়ন শুরু করেন।
বলা হয়, তিনি যে গ্রন্থাগারে অধ্যয়নের সুযোগ পেয়েছিলেন, সেখানে সংরক্ষিত অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ গভীরভাবে অধ্যয়ন করে আত্মস্থ করেছিলেন। মাত্র সতেরো বছর বয়সেই তিনি সমকালীন জ্ঞানের প্রায় সব প্রধান শাখায় দক্ষতা অর্জন করেন এবং উনিশ বছর বয়সে বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস, অর্থনীতি, রাজনীতি, সাহিত্য ও চিকিৎসাবিদ্যায় অসাধারণ পাণ্ডিত্যের পরিচয় দেন।
মাত্র একুশ বছর বয়সে তিনি ‘আল-মাজমুয়া’ নামে একটি বিশ্বকোষ রচনা করেন, যেখানে গণিত ব্যতীত প্রায় সব জ্ঞানের বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তীতে চিকিৎসা, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব, সাহিত্য, পদার্থবিজ্ঞান ও গণিতসহ নানা বিষয়ে তিনি শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেন।
তাঁর অমর কীর্তিগুলোর মধ্যে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ হলো ‘আল-কানুন ফিৎ-তিব্ব’ (The Canon of Medicine)। চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই মহাগ্রন্থ দীর্ঘ প্রায় পাঁচ শতাব্দী ধরে ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠ্যপুস্তক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ল্যাটিন, ইংরেজি, হিব্রুসহ বহু ভাষায় অনূদিত এই গ্রন্থ চিকিৎসা জগতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দেয়।
পাঁচ খণ্ডে বিভক্ত ‘আল-কানুন’-এ মানবদেহের অঙ্গসংস্থান, রোগতত্ত্ব, রোগ নির্ণয়, ওষুধবিজ্ঞান এবং চিকিৎসা পদ্ধতির বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে। বহু জটিল রোগের কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা সম্পর্কে তিনি যে তথ্য প্রদান করেছিলেন, তা শতাব্দীর পর শতাব্দী চিকিৎসকদের জন্য নির্ভরযোগ্য নির্দেশিকা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
ইবনে সিনা ছিলেন আধুনিক ফার্মাকোলজি ও ক্লিনিক্যাল মেডিসিনের অন্যতম পথিকৃৎ। তিনি মানুষের চোখের গঠন সম্পর্কে সঠিক ব্যাখ্যা দেন, যক্ষ্মাকে একটি সংক্রামক রোগ হিসেবে শনাক্ত করেন এবং মেনিনজাইটিস রোগেরও প্রাথমিক বর্ণনা প্রদান করেন। পানি ও ভূমিবাহিত রোগ সম্পর্কে তাঁর পর্যবেক্ষণ ছিল যুগান্তকারী।
চিকিৎসা বিজ্ঞানে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদানগুলোর একটি হলো হলিস্টিক মেডিসিন ধারণা, যেখানে রোগীর শারীরিক, মানসিক ও আত্মিক অবস্থাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করে চিকিৎসা প্রদানের কথা বলা হয়। আধুনিক সমন্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থার ভিত্তি নির্মাণে এই ধারণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাশাপাশি দর্শনেও তিনি ছিলেন সমানভাবে খ্যাতিমান। তাঁর আরেক বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আশ-শিফা’ ছিল দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রাণীতত্ত্ব ও উদ্ভিদতত্ত্বের এক বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার। তিনি অ্যারিস্টটলের দর্শন গভীরভাবে অধ্যয়ন করলেও নিজস্ব চিন্তা ও যুক্তির আলোকে অনেক বিষয়ে স্বতন্ত্র মত প্রকাশ করেছিলেন।
জ্ঞান ও মানবকল্যাণের সাধনায় তিনি সারা জীবন নিরলস পরিশ্রম করেছেন। ভ্রমণ করেছেন এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে, জ্ঞানের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের লক্ষ্যে। তাঁর চিন্তা, গবেষণা ও রচনাকর্ম শুধু মুসলিম বিশ্বেই নয়, সমগ্র মানবসভ্যতার অমূল্য সম্পদ হয়ে রয়েছে।
১০৩৭ খ্রিস্টাব্দের ২১ জুন এই মহান চিকিৎসাবিদ, দার্শনিক ও বিজ্ঞানী মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তাঁর কর্ম, চিন্তা ও অবদান আজও বিশ্বজুড়ে সমানভাবে সমাদৃত।
ইবনে সিনা শুধু একজন চিকিৎসক ছিলেন না; তিনি ছিলেন জ্ঞানের এক মহাসমুদ্র, যাঁর আলো আজও চিকিৎসা বিজ্ঞান ও মানবসভ্যতার পথকে আলোকিত করে চলেছে।