খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৯ জানুয়ারি ২০২৬
প্রতিমা ঠাকুর ছিলেন এক বহুমাত্রিক সৃজনশীল প্রতিভা—লেখিকা, কবি, চিত্রশিল্পী ও নৃত্যবিশারদ। তিনি কেবল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্রবধূ কিংবা রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী হিসেবেই পরিচিত নন; শান্তিনিকেতনের শিল্প–সংস্কৃতি ও নৃত্যনাট্যের ইতিহাসে তিনি এক অপরিহার্য নাম।
১৮৯৩ সালের ৫ নভেম্বর তাঁর জন্ম। পিতা শেষেন্দ্রভূষণ চট্টোপাধ্যায় এবং মাতা বিনয়িনী দেবী। মাত্র ১১ বছর বয়সে প্রতিমার প্রথম বিয়ে হয় নীলানাথের সঙ্গে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে গঙ্গায় সাঁতার কাটতে গিয়ে নীলানাথের অকালমৃত্যু ঘটে এবং অল্প বয়সেই প্রতিমা বিধবা হন।
রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী মৃণালিনী দেবী ছোট প্রতিমাকে দেখে তাঁকে নিজের পুত্রবধূ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু মৃণালিনী দেবীর অকালপ্রয়াণে সে ইচ্ছা পূরণ হয়নি। পরবর্তীকালে রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিলেত থেকে দেশে ফিরলে রবীন্দ্রনাথ সমাজের প্রচলিত বিধিনিষেধ অগ্রাহ্য করে প্রতিমা ও রথীন্দ্রনাথের বিবাহের সিদ্ধান্ত নেন। এই বিবাহ ছিল জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির প্রথম বিধবা বিবাহ—যা সেই সময়ে এক সাহসী সামাজিক দৃষ্টান্ত।
বিবাহের পর প্রতিমা দেবী নিজেকে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত করেন বিশ্বভারতী ও শান্তিনিকেতনের কাজে। শিল্প, শিক্ষা ও সংস্কৃতির নানা ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথের নির্ভরযোগ্য সহযাত্রী। কারুশিল্পের বিকাশে তাঁর বিশেষ ভূমিকা ছিল এবং রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্য পরিকল্পনায় তিনি ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা করেন।
তিনি ছিলেন একজন দক্ষ চিত্রশিল্পীও। কিছুদিন ইতালীয় শিল্পশিক্ষক গিলহার্ডির কাছে তিনি ছবি আঁকা শিখেছিলেন। নাচ ও নাটকের ক্ষেত্রে মঞ্চসজ্জা, পোশাক পরিকল্পনা এবং নৃত্যভঙ্গির দৃশ্যরূপ দিতেও তাঁর সূক্ষ্ম নান্দনিক দৃষ্টি প্রকাশ পেত।
বিয়ের অল্পদিন পরেই শান্তিনিকেতনে মেয়েদের প্রথম অভিনয় ‘লক্ষ্মীর পরীক্ষা’ নাটকে তিনি ক্ষীরির চরিত্রে অভিনয় করেন। শান্তিনিকেতনে মেয়েদের নৃত্যশিক্ষার সূচনায় তাঁর ভূমিকা ছিল পথিকৃতের মতো। রবীন্দ্রনাথের ‘বাল্মিকীপ্রতিভা’ ও ‘মায়ার খেলা’ নৃত্যনাট্যে তিনি নিজে নাচে অংশগ্রহণ করেন।
রবীন্দ্র নৃত্যনাট্যের প্রকৃত বিকাশে প্রতিমা দেবী ছিলেন প্রধান উৎসাহদাতা। তাঁর আগ্রহ ও অনুপ্রেরণায় রবীন্দ্রনাথ ‘চিত্রাঙ্গদা’ (বা ‘পরিশোধ’) নৃত্যনাট্য রচনার পরিকল্পনা করেন। প্রথমে বর্ষামঙ্গলের কয়েকটি নাচ রূপায়ণের পর তিনি রবীন্দ্রনাথকে ‘পূজারিনী’ কবিতার নৃত্যনাট্যরূপ দেওয়ার অনুরোধ করেন।
রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন উপলক্ষে মেয়েদের দিয়ে সেই নৃত্যনাট্য মঞ্চস্থ করার উদ্যোগ নেন প্রতিমা দেবী। এরই ধারাবাহিকতায় রবীন্দ্রনাথ লেখেন ‘নটীর পূজা’। বহু পরিশ্রমে তিনি শান্তিনিকেতনের মেয়েদের দিয়ে এই নাটকটি মঞ্চস্থ করান। এতে শ্রীমতীর ভূমিকায় নৃত্যাভিনয় করেন নন্দলাল বসুর কন্যা গৌরী।
১৩৩৭ বঙ্গাব্দে ‘নবীন’ অভিনয়ের সময় অধিকাংশ নাট্যপরিকল্পনাই তাঁর হাতে গড়া। প্রায় চৌদ্দ বছরের নিরলস শ্রমে তিনি ‘চিত্রাঙ্গদা’ নৃত্যনাট্যকে একটি স্থায়ী ও পরিপূর্ণ রূপ দিতে সক্ষম হন। নাচের পোশাক, মঞ্চসজ্জা ও রূপায়ণে তিনি শান্তিনিকেতনের নিজস্ব ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রাখতেন।
পরবর্তী সময়ে তিনি মঞ্চসজ্জার পরিকল্পনা নিজে ছবি এঁকে রাখতেন এবং কলাভবনের শিল্পীদের দিয়ে নৃত্যভঙ্গির অঙ্কন করানোর চেষ্টা করতেন। ‘মায়ার খেলা’ নাটককেও তিনি নতুন আঙ্গিকে রূপ দিয়েছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছের ‘ক্ষুধিত পাষাণ’, ‘দালিয়া’ এবং *‘কথা ও কাহিনী’*র ‘সামান্য ক্ষতি’—এই গল্পগুলিকে তিনি ট্যাবলোধর্মী মূকাভিনয়ে রূপায়িত করেন।
সাহিত্যের ক্ষেত্রেও প্রতিমা দেবীর অবদান উল্লেখযোগ্য। তিনি ‘কল্পিতাদেবী’ ছদ্মনামে প্রবাসী পত্রিকায় বহু কবিতা লিখেছেন—এই ছদ্মনামটি রবীন্দ্রনাথ নিজেই নির্ধারণ করে দেন। কখনো কখনো রবীন্দ্রনাথ তাঁর কবিতা সংশোধন করতেন। তাঁর গদ্যরচনায় লিপিকার একটি স্বতন্ত্র ভঙ্গি লক্ষ করা যায়। ‘স্বপ্নবিলাসী’ পড়ে রবীন্দ্রনাথ মুগ্ধ হয়ে লেখেন ‘মন্দিরার উক্তি’।
তাঁর রচিত ‘নির্বাণ’ গ্রন্থে রবীন্দ্রজীবনের শেষ দিকের ঘটনাবলি উঠে এসেছে। ‘স্মৃতিচিত্র’ গ্রন্থে আছে রবীন্দ্রনাথ ও অবনীন্দ্রনাথের স্মৃতি, বাড়ির মেয়েদের জীবন ও উৎসবের কথা। ‘নৃত্য’ গ্রন্থে তিনি শান্তিনিকেতনের নৃত্যধারা সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করেছেন। ‘চিত্রলেখা’ তাঁর কবিতা ও কথিকার সংকলন।
নারীশিক্ষা ও নারীকল্যাণেও তিনি ছিলেন গভীরভাবে সচেতন। শান্তিনিকেতনে মেয়েদের নিয়ে তিনি গড়ে তোলেন ‘আলাপিনী সমিতি’—যেখানে গান, অভিনয় ও সৃজনশীল চর্চা হতো। তাঁর ব্যবস্থাপনায় আশ্রমের মেয়েরা গ্রামে গিয়ে অশিক্ষিত নারীদের স্বাস্থ্যকর খাদ্য প্রস্তুত, শরীরচর্চা, পরিচ্ছন্নতা ও হাতের কাজ শেখাতেন।
এই মহীয়সী নারী ১৯৬৯ সালের ৯ জানুয়ারি পরলোকগমন করেন। শিল্প, সাহিত্য, নৃত্য ও সমাজকল্যাণে তাঁর নিঃশব্দ অথচ গভীর অবদান আজও শান্তিনিকেতনের বাতাসে অনুরণিত।
শ্রদ্ধাঞ্জলিতে স্মরণ।