খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬
রুশ সাহিত্যজগতের এক অবিস্মরণীয় নাম ম্যাক্সিম গোর্কি—যিনি শুধু একজন লেখক নন, বরং সমাজ-সংগ্রামের এক সাহসী কণ্ঠস্বর। তাঁর প্রকৃত নাম আলেক্সেই ম্যাক্সিমোভিচ পেশকভ, তবে সাহিত্যজগতে তিনি ‘গোর্কি’—অর্থাৎ ‘তেতো’—নামেই চিরপরিচিত। এই নামের মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে তাঁর জীবনের কঠিন বাস্তবতা ও সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি।
জন্ম ও শৈশব
১৮৬৮ সালের ২৮ মার্চ রাশিয়ার নিজনি নোভগোরোদ-এ জন্মগ্রহণ করেন তিনি। অল্প বয়সেই পিতামাতাকে হারিয়ে অনিশ্চয়তা, দারিদ্র্য ও অবহেলার মধ্য দিয়ে তাঁর শৈশব কেটেছে। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা না থাকলেও জীবনই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় শিক্ষক।
সংগ্রামময় জীবন ও আত্মগঠন
কৈশোর থেকেই জীবিকার তাগিদে নানা পেশায় কাজ করেছেন—রাঁধুনি, জাহাজের কর্মচারী, শ্রমিক, এমনকি পথভ্রমণকারী হিসেবেও কাটিয়েছেন বহু সময়। এই দীর্ঘ ভ্রমণ ও কঠিন অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্যচিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
স্বশিক্ষিত এই লেখক ১৮৮২ সালে সাহিত্যচর্চা শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে তাঁর নিজস্ব শক্তিশালী ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি।
সাহিত্যকর্ম ও অবদান
গোর্কির লেখার মূল উপজীব্য ছিল সমাজের নিম্নবর্গের মানুষ—শ্রমিক, ভবঘুরে, বঞ্চিত মানুষের জীবনসংগ্রাম। তিনি সাহিত্যকে ব্যবহার করেছেন সামাজিক পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে।
তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনাগুলোর মধ্যে রয়েছে—
Mother (মা) — সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার এক অনন্য উপন্যাস
ফোমা গোর্দেয়েভ(১৯০০)
গল্পসংকলন স্কেচ এবং গল্প (১৮৯৮)
তাঁকেই সাধারণভাবে সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদ (Socialist Realism) ধারার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়—যা পরবর্তীকালে সোভিয়েত সাহিত্যের প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে।
রাজনৈতিক অবস্থান ও নির্বাসন
গোর্কি ছিলেন সময়ের প্রগতিশীল রাজনৈতিক চিন্তার একজন সক্রিয় সমর্থক। রুশ বিপ্লব-এর সময় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, যদিও কিছু বিষয়ে তিনি সমালোচনামুখরও ছিলেন।
রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে জীবনের একটি বড় সময় তাঁকে রাশিয়া ও পরবর্তীতে সোভিয়েত ইউনিয়নের বাইরে নির্বাসনে কাটাতে হয়।
মানবিক আবেদন ও দুর্ভিক্ষ
১৯২১ সালের দুর্ভিক্ষের সময় তিনি বিশ্ববাসীর কাছে মানবিক সহায়তার আহ্বান জানান। রাশিয়ান দুর্ভিক্ষ of 1921–1922-এ লাখো মানুষ চরম দুর্ভোগে পতিত হয় এবং বিপুল প্রাণহানি ঘটে। তাঁর এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক সহানুভূতি জাগাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ব্যক্তিগত জীবন ও মৃত্যু
১৯৩৪ সালে তাঁর একমাত্র পুত্র ম্যাক্সিম পেশকভের আকস্মিক মৃত্যু তাঁকে গভীরভাবে আঘাত করে।
অবশেষে ১৯৩৬ সালের ১৮ জুন নিউমোনিয়ায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যু নিয়েও ইতিহাসে নানা বিতর্ক রয়েছে, যা আজও গবেষণার বিষয়।
স্বীকৃতি ও উত্তরাধিকার
গোর্কি পাঁচবার সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন। যদিও তিনি পুরস্কারটি পাননি, তাঁর সাহিত্যকীর্তি বিশ্বসাহিত্যে অমর হয়ে আছে।
তিনি শুধু একজন লেখক নন—তিনি ছিলেন এক যুগের কণ্ঠস্বর, নিপীড়িত মানুষের প্রতিনিধি এবং সাহিত্যের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের এক অগ্রদূত।
ম্যাক্সিম গোর্কি আমাদের মনে করিয়ে দেন—সাহিত্য শুধু বিনোদন নয়, এটি সংগ্রাম, প্রতিবাদ এবং মানবমুক্তির এক শক্তিশালী মাধ্যম।
আজ তাঁর জন্মতিথিতে বিনম্র শ্রদ্ধার্ঘ্য।