খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৩ মার্চ ২০২৫
সৈয়দ আসাদ উজ জামান( মিনার)
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস চেতনার উত্থান-পতনের সাক্ষী বহন করে। রাজনৈতিক দলের মতাদর্শ চিহ্নিত করার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে স্লোগান। “জয় বাংলা”, “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ”, “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” শুনলে কি বোঝা যায় দলটির মানসিক প্রেরণার উৎস কী?
কবি কুসুমকুমারী দাসের মতে, একমাত্র শ্লোগানের উপর নির্ভর করে নয়, কর্মতৎপরতা ও বিবেচনায় নিতে হবে। তিনি লিখেছিলেন—
“আমার দেশে হবে সেই ছেলে কবে,
কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।”
আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ ধারাবাহিক রাজনৈতিক কর্মপ্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছে। শুরুটা হয়েছিল ১৯২০-১৯৪০-এর দশকে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, কমিউনিস্ট পার্টি ও অন্যান্য বিপ্লবী রাজনৈতিক দল এই আন্দোলনে অবদান রাখেন। তাদের রাজনৈতিক স্লোগান ছিল “ইনকিলাব জিন্দাবাদ”। ভগৎ সিং, সুভাষচন্দ্র বসু এবং অন্যান্য বিপ্লবী গোষ্ঠীর মাধ্যমে এই স্লোগানটি পরিচিতি লাভ করে।
ব্রিটিশ নীতি “Divide and Rule”এবং মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ধর্মের ভিত্তিতে “দ্বিজাতি তত্ত্ব”এর উপর নির্ভর করে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত ও পাকিস্তানের পৃথক রাষ্ট্র পরিণত হওয়ার পূর্ব ও পরে আরো কিছু স্লোগান জনপ্রিয়তা লাভ করে।
ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল স্লোগান ছিল “ব্রিটিশ ভারতের স্বরাজ চাই”। সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে জাতীয়বাদী স্লোগান ছিল “জয় হিন্দ”।
মুসলিম লীগের স্বাধীন পাকিস্তানের দাবির প্রধান স্লোগান ছিল “লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান”। পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের জন্য মুসলিমদের ঐক্যের প্রতীক হলো “পাকিস্তান জিন্দাবাদ” স্লোগানটি।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতা ছিলেন মাদারীপুরের স্কুল শিক্ষক পূর্ণচন্দ্র দাস। এই কৃতি সন্তানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২২ সালে “ভাঙার গান” কাব্যে “পূর্ণ-অভিনন্দন” কবিতায় “জয় বাংলা” যুগল শব্দটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন:
“জয় বাংলার পূর্ণচন্দ্র, জয় জয় আদি-অন্তরীণ,
জয় যুগে যুগে আসা সেনাপতি, জয় প্রাণ আদি-অন্তহীন।”
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম “জয় বাংলা” স্লোগানটি ব্যবহার করেন।
“পাকিস্তান জিন্দাবাদ” কেন দীর্ঘজীবন লাভ করল না, বাংলাদেশের মুসলিম সমাজ ও রাষ্ট্রের নাগরিকগণও কেন “পাকিস্তান জিন্দাবাদ”এর পরিবর্তে “জয় বাংলা” স্লোগানটি জাতীয় স্লোগানে পরিণত করলেন, আবার “পাকিস্তান জিন্দাবাদ”-এর ধারাবাহিকতায় “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ” কীভাবে আমাদের মধ্যে এল, “জয় বাংলা” কি “জয় হিন্দ” থেকে এসেছে নাকি একজন মুসলিম কবির হিন্দু দেশপ্রেমিকের উদ্দেশ্যে সাম্প্রদায়িক-মুক্ত চিন্তা ও রাষ্ট্রের জন্য ধর্মনিরপেক্ষ ভাবনা থেকে উদ্বুদ্ধ হয়েছে—তা বিশ্লেষণের দায়িত্ব ব্যক্তিগত চেতনার উপর নির্ভর করে।
ইতিহাস সাক্ষী দেয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলনে দু-একজন রাজাকারের মুখে”ইনকিলাব জিন্দাবাদ” স্লোগানটি শোনা গেলেও বাংলাদেশের রাষ্ট্র গঠনের সাথে স্লোগানটির কোনো সম্পর্ক ছিল না কিন্তু স্বাধীনতার ধারাবাহিকতার সাথে সম্পর্ক অস্বীকার করা যায় না। যদিও স্বাধীনতার পরবর্তীতে সামান্য হলেও স্লোগানটির ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। স্লোগানটি অসহায় পঙ্গু মানুষের মতো কোথায় যেন পড়েছিল। বর্তমান সময়ে একজন ইউটিউবারের মাধ্যমে স্লোগানটি বেশ পরিচিতি লাভ করে। নতুন রাজনৈতিক দলের নেতাদের মুখেও শোনা যাচ্ছে।
আপনি ইসলামিস্ট হতে পারেন, ন্যাশনালিস্ট হতে পারেন—কোনো অসুবিধা নেই। যখন স্বাধীন বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থার জন্য রাজনীতি করবেন, তখন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সাথে স্লোগানের সাংঘর্ষিকতা আছে কিনা তা অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। বাংলাদেশে বাঙালিসহ প্রায় অর্ধশতাধিক জাতির বসবাস; প্রত্যেকেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সম্মানিত নাগরিক। রাষ্ট্র ও নাগরিকদের সম্মান অক্ষুন্ন রাখার দায়িত্ব শাসক ও প্রত্যেক রাজনৈতিক দলকে স্বীকার করতে হবে। রাজনৈতিক স্লোগানের মধ্য দিয়ে যদি ঐক্য প্রতিষ্ঠান না হয়, তবে টেকসই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা কি করে প্রতিষ্ঠিত হবে?
আমরা কি শুধু সৈয়দ শামসুল হকের কবিতা আবৃত্তি করে যাব সারা জীবন :
“নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়
যখন শকুনি নেমে আসে এই সোনার বাংলায়,
নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়
যখন এ দেশ ছেয়ে যায় দালালের আলখাল্লায়,”
নুরুলদীনেরা আর কতদিন বজ্রকন্ঠে আওয়াজ তুলবে
“জাগো বাহে কোনঠে সবাই “
খবরওয়ালা/এসআর