খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৫ এপ্রিল ২০২৬
ফুটবল বিশ্বের অন্যতম সৃজনশীল মিডফিল্ডার এবং ব্রাজিলের প্রাক্তন তারকা অস্কার দস সান্তোস জুনিয়র মাত্র ৩৪ বছর বয়সে পেশাদার ফুটবল থেকে আকস্মিক অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। শৈশবের ক্লাব সাও পাওলোর হয়ে মাঠে দাপিয়ে বেড়ানোর স্বপ্ন থাকলেও, গুরুতর শারীরিক অসুস্থতা তাকে বাধ্য করেছে বুট জোড়া তুলে রাখতে। হৃদরোগজনিত জটিলতার কারণে এই তারকা ফুটবলারকে ক্যারিয়ারের এমন অসময়ে বিদায় জানাতে হলো।
২০২৪ সালে অস্কার তার প্রিয় ক্লাব সাও পাওলোতে ফিরে এসেছিলেন একরাশ প্রত্যাশা নিয়ে। ক্লাবটির সাথে তার ২০২৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি ছিল। তবে গত বছরের নভেম্বর মাসে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। নিবিড় পর্যবেক্ষণের পর চিকিৎসকরা তার শরীরে ভ্যাসোভেগাল সিনকোপ (Vasovagal Syncope) নামক একটি বিরল ও জটিল সমস্যা শনাক্ত করেন।
এই রোগের প্রভাবে মানুষের রক্তচাপ এবং হৃদস্পন্দন হঠাৎ করেই অস্বাভাবিক মাত্রায় কমে যায়, যার ফলে রোগী মুহূর্তের মধ্যে জ্ঞান হারিয়ে ফেলতে পারেন। একজন পেশাদার অ্যাথলেটের জন্য মাঠের তীব্র উত্তেজনার মধ্যে এই শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। চিকিৎসকদের পরামর্শে জীবন ও স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে ক্লাব এবং অস্কার সমঝোতার ভিত্তিতে চুক্তি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেন।
অস্কারের ফুটবল যাত্রা শুরু হয়েছিল ব্রাজিলের ক্লাব ইন্টারনাসিওনালের হয়ে। তবে তিনি বিশ্বমঞ্চে নিজের জাত চিনিয়েছেন ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলে। বিশেষ করে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব চেলসির হয়ে তার পারফরম্যান্স ছিল অনবদ্য। স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে থাকাকালীন তিনি নিজেকে বিশ্বের অন্যতম সেরা প্লে-মেকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। পরবর্তীতে তিনি রেকর্ড ট্রান্সফার ফিতে চীনের সাংহাই পোর্টে যোগ দিয়ে এশিয়ান ফুটবলেও নিজের আধিপত্য ধরে রাখেন।
নিচে অস্কারের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের কিছু উল্লেখযোগ্য পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলো:
| বিভাগ/দল | উল্লেখযোগ্য অর্জন ও সাফল্য | শিরোপা সংখ্যা |
| ব্রাজিল জাতীয় দল | ফিফা কনফেডারেশনস কাপ (২০১৩) | ০১ |
| চেলসি (ইংল্যান্ড) | ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, উয়েফা ইউরোপা লিগ, লিগ কাপ | ০৪ |
| সাংহাই পোর্ট (চীন) | চাইনিজ সুপার লিগ, চাইনিজ এফএ সুপার কাপ | ০৪ |
| আন্তর্জাতিক গোল | ২০১৪ বিশ্বকাপে জার্মানির বিপক্ষে একমাত্র গোলসহ ৪৮ ম্যাচে ১২ গোল | – |
ব্রাজিলের হলুদ জার্সিতে অস্কার ছিলেন অত্যন্ত নির্ভরশীল একজন সৈনিক। ২০১৩ সালে ফিফা কনফেডারেশনস কাপ জয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তবে ভক্তদের স্মৃতিতে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে জার্মানির বিপক্ষে সেই বিষাদময় সেমিফাইনালের জন্য। সেই ম্যাচে ব্রাজিল সাত গোল হজম করলেও, শেষ বাঁশি বাজার ঠিক আগ মুহূর্তে দলের হয়ে একমাত্র সান্ত্বনা গোলটি করেছিলেন অস্কার। এটিই ছিল সেই ম্যাচে সেলেসাওদের একমাত্র প্রাপ্তি।
অবসরের ঘোষণা দিতে গিয়ে এক ভিডিও বার্তায় অস্কার অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তিনি বলেন:
“আমি আরও অনেক দিন ফুটবল খেলতে চেয়েছিলাম। সাও পাওলোর হয়ে জেতার অনেক স্বপ্ন ছিল আমার। কিন্তু শরীর সবসময় মনের সাথে তাল মেলাতে পারে না। চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া ছাড়া আমার উপায় নেই। আমি এখন থেকে মাঠের খেলোয়াড় নই, বরং গ্যালারির একজন কড়া সমর্থক হিসেবে ক্লাবের পাশে থাকব।”
অস্কারের এই প্রস্থান ফুটবল বিশ্বের জন্য একটি অপূরণীয় ক্ষতি। তার শৈল্পিক পাস, দূরপাল্লার শট এবং শান্ত মেজাজের ফুটবল খেলার ধরন ভক্তদের হৃদয়ে আজীবন গেঁথে থাকবে। তার উত্তরসূরিদের জন্য তিনি রেখে গেলেন এক বিশাল অনুপ্রেরণা এবং সাফল্যের এক অনন্য মানদণ্ড। যদিও তিনি মাঠ থেকে বিদায় নিচ্ছেন, তবে ফুটবলের ইতিহাসের পাতায় অস্কারের নাম উজ্জ্বল অক্ষরে লেখা থাকবে।