খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের কৃষিপ্রধান দেশ ইরান ২০২৪ সালে তাদের অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল খেজুর রপ্তানিতে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য তথ্য ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিগত এক বছরে দেশটির তাজা ও শুকনা খেজুর রপ্তানি থেকে অর্জিত আয়ের পরিমাণ পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ইরানের এই ধারাবাহিক অগ্রগতি দেশটির অ-তেল বাণিজ্যে কৃষি খাতের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বকে বিশ্বমঞ্চে নতুন করে তুলে ধরেছে।
ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড সেন্টার (ITC)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইরান মোট ৩ লাখ ৩২ হাজার ৩৪৬ টন খেজুর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করেছে। এই বিশাল পরিমাণ পণ্য থেকে দেশটি মোট ২১৩.০৪৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেছে। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছর প্রতি টন ইরানি খেজুরের গড় রপ্তানি মূল্য ছিল প্রায় ৬৪১ ডলার। মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চ চাহিদা এবং গুণগত মান উন্নয়নের ফলে এই খাতের আয় ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০২৪ সালে ইরানি খেজুরের প্রধান আমদানিকারক দেশসমূহ:
| দেশের নাম | রপ্তানির হার (শতাংশ) | অবস্থান |
| ভারত | ১৯.৫% | প্রথম |
| সংযুক্ত আরব আমিরাত | ১১% | দ্বিতীয় |
| পাকিস্তান | ৭.৩% | তৃতীয় |
| তুরস্ক | ৬.৮% | চতুর্থ |
| কাজাখস্তান | ৪.৯% | পঞ্চম |
ইরান বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ খেজুর উৎপাদনকারী দেশ। দেশটির কেরমান, সিস্তান-বালুচিস্তান, হরমোজগান, খুজেস্তান, বুশেহর ও ফারস প্রদেশে বাণিজ্যিকভাবে উন্নত জাতের খেজুর চাষ করা হয়। বর্তমানে ইরানে উৎপাদিত খেজুরের প্রায় ৭০ শতাংশ অভ্যন্তরীণ বাজারে ব্যবহৃত হয়, যার চাহিদা পবিত্র রমজান মাসে কয়েক গুণ বেড়ে যায়। অবশিষ্ট ৩০ শতাংশ বা প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার টন খেজুর আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করা হয়। ইরানের কৃষি মন্ত্রণালয় এখন খেজুর থেকে সিরাপ, পেস্ট ও চকোলেটের মতো মূল্য সংযোজিত (Value-added) পণ্য উৎপাদনে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে, যা রপ্তানি আয় ৪-৫০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে সহায়ক হবে।
ইরানের সামগ্রিক অর্থনীতিতে কৃষি খাত একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। দেশটির জিডিপিতে এই খাতের অবদান ১১ থেকে ১৪ শতাংশ এবং এটি মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ১৮ শতাংশ জোগান দেয়। বৈচিত্র্যময় জলবায়ুর কল্যাণে ইরান বার্ষিক ১২৫ থেকে ১৩০ মিলিয়ন টন কৃষিপণ্য উৎপাদন করে, যার বাজারমূল্য ৭০ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
ইরানের কৃষি খাতের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
খাদ্য নিরাপত্তা: দেশটি তার অভ্যন্তরীণ খাদ্য চাহিদার ৮৩ থেকে ৯০ শতাংশ নিজে উৎপাদন করতে সক্ষম।
বৈশ্বিক র্যাঙ্কিং: পেস্তা, খেজুর, মধু ও আখরোট উৎপাদনে ইরান বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি। বিশেষ করে ৬ লাখ হেক্টরের বেশি জমিতে পেস্তা চাষ করে ইরান বিশ্বে অনন্য রেকর্ড গড়েছে।
অ-তেল রপ্তানি: কৃষিপণ্য ইরানের মোট অ-তেল রপ্তানির ১৭.৭ থেকে ৩০ শতাংশ দখল করে আছে এবং বর্তমানে বিশ্বের ৮০টির বেশি দেশে এই পণ্যগুলো পৌঁছে যাচ্ছে।
সাফল্য সত্ত্বেও ইরানের কৃষি খাত বর্তমানে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। দীর্ঘস্থায়ী খরা ও পানির তীব্র সংকট ফসল উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও বৈদেশিক মুদ্রা বরাদ্দের সমস্যার কারণে কৃষকরা সার ও উন্নত বীজ সংগ্রহের ক্ষেত্রে বাধার সম্মুখীন হন। তবুও ইরান সরকার আধুনিক সেচ ব্যবস্থার প্রসার এবং জ্ঞানভিত্তিক (Knowledge-based) প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তার মাধ্যমে কৃষিপণ্যের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করে যাচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য হলো—প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ফসল-পরবর্তী ক্ষতি (যা বর্তমানে প্রায় ৩০ শতাংশ) কমিয়ে আনা এবং রপ্তানি বাণিজ্যে কৃষির অংশ আরও শক্তিশালী করা।