নতুন বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতেই দেশের সড়ক, নৌ ও রেলপথে দুর্ঘটনার ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। সারাদেশে ৫৫৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪৮৭ জন, আহত হয়েছেন আরও এক হাজার ১৯৪ জন। এর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাই সবচেয়ে বেশি প্রাণ কেড়ে নিয়েছে—যা সামগ্রিক মৃত্যুর প্রায় ৪০ শতাংশেরও বেশি।
বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান স্বাক্ষরিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। দেশের ৯টি জাতীয় দৈনিক, ৭টি অনলাইন সংবাদমাধ্যম, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং সংগঠনের নিজস্ব তথ্যভান্ডারের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি প্রণয়ন করা হয়েছে।
সড়ক দুর্ঘটনার সারসংক্ষেপ
| সূচক | সংখ্যা |
|---|---|
| মোট সড়ক দুর্ঘটনা | ৫৫৯টি |
| মোট নিহত | ৪৮৭ জন |
| মোট আহত | ১,১৯৪ জন |
| মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা | ২০৮টি |
| মোটরসাইকেলে নিহত | ১৯৬ জন |
| মোট নিহতের মধ্যে মোটরসাইকেল শতাংশ | ৪০.২৪% |
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৮টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৯৬ জন নিহত হয়েছেন। সহজলভ্যতা, দ্রুতগতি এবং তুলনামূলক কম নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে মোটরসাইকেল এখন দুর্ঘটনার বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার না করা, অপ্রাপ্তবয়স্ক চালনা এবং বেপরোয়া ওভারটেকিংয়ের প্রবণতাও এতে বড় ভূমিকা রাখছে।
লিঙ্গ ও বয়সভিত্তিক চিত্র
নিহতদের মধ্যে ৬৮ জন নারী এবং ৫৭ জন শিশু। অর্থাৎ মোট প্রাণহানির একটি উল্লেখযোগ্য অংশই নারী ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের। শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন ৫৭ জন, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
পেশাভিত্তিক নিহতদের পরিসংখ্যান (নির্বাচিত)
| পেশা | নিহতের সংখ্যা |
|---|---|
| পুলিশ সদস্য | ২ |
| শিক্ষক | ১৩ |
| চিকিৎসক | ২ |
| সাংবাদিক | ৬ |
| আইনজীবী | ৪ |
| ব্যাংক/বীমা কর্মকর্তা-কর্মচারী | ১১ |
| এনজিও কর্মী | ১৯ |
| রাজনৈতিক নেতাকর্মী | ২৭ |
| ব্যবসায়ী | ২১ |
| বিক্রয় প্রতিনিধি | ২৬ |
| পোশাক শ্রমিক | ৯ |
| নির্মাণ শ্রমিক | ৬ |
| প্রতিবন্ধী ব্যক্তি | ৩ |
| শিক্ষার্থী | ৫৭ |
এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট, দুর্ঘটনা সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সমানভাবে আঘাত করছে।
বিভাগভিত্তিক পরিস্থিতি
বিভাগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে ঢাকা বিভাগে—১১৯ জন। সবচেয়ে কম ১৮ জন নিহত হয়েছেন সিলেট বিভাগে। শুধু রাজধানী ঢাকাতেই নিহত হয়েছেন ১৮ জন, যা নগর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও সড়কশৃঙ্খলার অভাবকে নতুন করে সামনে আনে।
নৌ ও রেল দুর্ঘটনা
সড়কপথের পাশাপাশি জানুয়ারিতে ৪টি নৌ দুর্ঘটনায় ৬ জন নিহত ও ৭ জন আহত হয়েছেন। রেলপথে ৪১টি দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ৩২ জনের, আহত হয়েছেন ১৭ জন। ফলে সামগ্রিক পরিবহন খাতে এক মাসেই মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৫২৫ জনে।
দুর্ঘটনার প্রধান কারণ
প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত ও মানবিক কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে—ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, নাজুক সড়ক অবকাঠামো, অতিরিক্ত গতি, চালকের অদক্ষতা ও মানসিক চাপ, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ও বেতন কাঠামোর অভাব, ট্রাফিক আইন অমান্য, মহাসড়কে ধীরগতির যান চলাচল, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কার্যকর মনিটরিং, কঠোর আইন প্রয়োগ, চালকদের প্রশিক্ষণ ও বিশ্রামের নিশ্চয়তা, এবং মোটরসাইকেল ব্যবহারে কড়াকড়ি নিয়ন্ত্রণ আরোপ ছাড়া এই প্রাণঘাতী প্রবণতা রোধ করা সম্ভব নয়। নতুন বছরের শুরুতেই এমন উচ্চ প্রাণহানি দেশের সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য স্পষ্ট সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।