খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশের প্রখ্যাত ভাস্কর ও শিল্পী
(১৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৭ – ৬ মার্চ ২০১৮)
বাংলাদেশের ভাস্কর্য জগতে এক অনন্য নাম ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী। সহজলভ্য উপকরণ দিয়ে নান্দনিক শিল্পসৃষ্টি—এই স্বকীয় ধারা তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে যেমন জনপ্রিয় করেছে, তেমনি শিল্পাঙ্গনে এনে দিয়েছে বিশেষ মর্যাদা। তাঁর শিল্পকর্মে ছিল প্রকৃতি, জীবনসংগ্রাম ও মানবিক বোধের গভীর প্রকাশ।
জন্ম ও শিক্ষাজীবন
১৯৪৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি খুলনায় মাতুলালয়ে তাঁর জন্ম। পিতা সৈয়দ মাহবুবুল হক ও মাতা রওশন হাসিনা। ১১ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়।
খুলনার পাইওনিয়ার গার্লস স্কুল থেকে এসএসসি এবং খুলনা গার্লস স্কুল থেকে এইচএসসি ও ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।
ব্যক্তিজীবন ও কর্মজীবন
১৯৬৩ সালে তিনি প্রথম বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। পরে ১৯৭২ সালে দ্বিতীয়বার বিবাহ করেন। তাঁর দ্বিতীয় স্বামী আহসান উল্লাহ আহমেদ ছিলেন একজন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা। তাঁদের তিন পুত্র ও তিন কন্যা রয়েছে।
১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছেন। কিছুদিন শিক্ষকতাও করেছেন। এছাড়া তিনি জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি), খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), ইউনিসেফ এবং কানাডিয়ান দূতাবাসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেন।
জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে তিনি সম্পূর্ণভাবে শিল্পচর্চায় মনোনিবেশ করেন এবং অবিরাম সৃষ্টিকর্মে যুক্ত থাকেন।
শিল্পধারা ও অবদান
ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর শিল্পচর্চার সূচনা হয় ঘর সাজানোর সহজ উপায় খুঁজতে গিয়ে। দামী উপকরণের পরিবর্তে ঝরা পাতা, শুকনো ডাল, গাছের গুঁড়ি, কাঠের টুকরো প্রভৃতি সহজলভ্য প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে তিনি অসাধারণ নান্দনিক ভাস্কর্য ও গৃহসজ্জার শিল্পকর্ম তৈরি করেন।
তিনি দেখিয়েছেন—নিম্ন আয়ের মানুষও স্বল্প খরচে সৃজনশীল উপায়ে নিজেদের বাসস্থানকে সুন্দর করে তুলতে পারে। তাঁর কাজ ছিল প্রকৃতি ও মানুষের অন্তর্গত সম্পর্কের এক শিল্পিত প্রকাশ।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও নারীর আত্মমর্যাদা নিয়েও তিনি কাজ করেছেন। তাঁর শিল্পে ব্যক্তিগত যন্ত্রণা ও জাতীয় ইতিহাসের ছাপ গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি
শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের জন্য ২০১০ সালে তাঁকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করা হয়।
এছাড়াও তিনি—
দ্য রিডার্স ডাইজেস্টের হিরো (ডিসেম্বর ২০০৪) সম্মাননা
অনন্যা শীর্ষ পদক
রৌপ্য জয়ন্তী পুরস্কার (ওয়াইডব্লিউসিএ)
বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার পুরস্কার
ইত্যাদি সম্মানে ভূষিত হন।
প্রয়াণ ও উত্তরাধিকার
২০১৮ সালের ৬ মার্চ তিনি পরলোকগমন করেন। তবে তাঁর শিল্পদর্শন আজও প্রাসঙ্গিক—সরলতার মধ্যেই সৌন্দর্য, প্রকৃতির মধ্যেই সৃষ্টির শক্তি।
ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী কেবল একজন ভাস্কর নন; তিনি ছিলেন সাহস, সৃজনশীলতা ও আত্মমর্যাদার প্রতীক। তাঁর স্মৃতি ও সৃষ্টিকর্ম বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির ভান্ডারে চিরঅম্লান হয়ে থাকবে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি।