খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বিশ্ববাণিজ্যের মোড়ল হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও বিচারবিভাগীয় সিদ্ধান্তে এক নজিরবিহীন নাটকীয়তা তৈরি হয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ওপর আরোপিত ‘পাল্টা শুল্ক’ (Reciprocal Tariffs) অবৈধ ঘোষণা করেছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। তবে আদালতের এই রায়ে পিছু না হটে বরং ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন ট্রাম্প এবং পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে সকল আমদানিকৃত পণ্যের ওপর নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। এই সিদ্ধান্ত বিশ্ববাজারে নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের ৯ জন বিচারপতির মধ্যে ৬ জনই ট্রাম্পের পূর্ববর্তী শুল্ক আরোপের প্রক্রিয়াকে আইনিভাবে ত্রুটিপূর্ণ বলে রায় দিয়েছেন। আদালত পর্যবেক্ষণে জানিয়েছেন, ট্রাম্প ‘ইন্টারন্যাশনাল ইমারজেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট’ (IEEPA) ব্যবহার করে যে শুল্ক আরোপ করেছিলেন, সেই আইনটি প্রেসিডেন্টকে এমন একতরফা শুল্ক আরোপের চূড়ান্ত ক্ষমতা দেয় না। সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতির মতে, এটি ক্ষমতার অপব্যবহারের শামিল।
তবে বাকি তিন বিচারপতি ট্রাম্পের এই প্রক্রিয়াকে সমর্থন জানিয়েছিলেন, যদিও তা রায়ে কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। আদালতের এই ঐতিহাসিক রায়ের ফলে গত বছরের ২ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া বিভিন্ন দেশের ওপর আরোপিত অতিরিক্ত শুল্ক এখন অকার্যকর বলে গণ্য হবে।
সুপ্রিম কোর্টের এই সিদ্ধান্ত আসার পরপরই হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্প একে ‘জাতির জন্য অসম্মানজনক’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বিচারপতিদের তীব্র সমালোচনা করে বলেন যে, তাঁরা আমেরিকানদের স্বার্থ না দেখে বিদেশিদের স্বার্থ রক্ষা করছেন। তিনি আদালতের রায়ের তোয়াক্কা না করে জানিয়ে দেন যে, তিনি বিকল্প আইন যেমন—১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইন এবং ১৯৬২ সালের বাণিজ্য সম্প্রসারণ আইন ব্যবহার করে সকল দেশের ওপর ১০ শতাংশ নতুন শুল্ক কার্যকর করবেন।
বাংলাদেশের জন্য এই রায় একই সাথে স্বস্তির ও নতুন চিন্তার কারণ। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণের পর বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য পণ্যের ওপর শুল্কের পাহাড় চেপে বসেছিল। আদালতের এই রায়ের ফলে সেই অতিরিক্ত ‘পাল্টা শুল্ক’ বাতিল হতে যাচ্ছে, তবে ট্রাম্পের ঘোষিত নতুন ১০ শতাংশ শুল্ক আবার বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
নিচে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্কের পরিবর্তনের একটি রূপরেখা দেওয়া হলো:
| পর্যায় | শুল্কের হার (%) | প্রেক্ষাপট ও সময়কাল |
| স্বাভাবিক শুল্ক | ১৫% | সাধারণ বাণিজ্যিক নিয়ম অনুযায়ী আগে থেকেই কার্যকর। |
| সর্বোচ্চ পাল্টা শুল্ক | ৩৭% | গত বছরের এপ্রিলে ট্রাম্প কর্তৃক আরোপিত (সর্বমোট ৫২%)। |
| হ্রাসকৃত পাল্টা শুল্ক | ১৯% | চলতি মাসে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির পর নির্ধারিত। |
| আদালতের রায় পরবর্তী | ০% | সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক পাল্টা শুল্ক অবৈধ ঘোষণা করায়। |
| ট্রাম্পের নতুন প্রস্তাব | ১০% | আদালতের রায়ের প্রতিবাদে ঘোষিত নতুন অতিরিক্ত শুল্ক। |
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই অনড় অবস্থান বিশ্ব সরবরাহ চেইনকে (Supply Chain) আবারও হুমকির মুখে ফেলবে। ইওয়াই-পার্থেননের প্রধান অর্থনীতিবিদ গ্রেগরি ডাকো বলেন, আদালতের রায়ের ফলে গড় শুল্ক হার ১৬.৮ শতাংশ থেকে ৯.৫ শতাংশে নেমে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, যা বিশ্ববাণিজ্যের জন্য ইতিবাচক ছিল। কিন্তু ট্রাম্পের নতুন ১০ শতাংশ শুল্কের হুমকি সেই স্বস্তিকে ম্লান করে দিয়েছে।
বাংলাদেশের মতো রপ্তানিমুখী দেশগুলোর জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো যুক্তরাষ্ট্রের সাথে হওয়া বিদ্যমান বাণিজ্য চুক্তিগুলো টিকিয়ে রাখা। যদিও ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ভারতের মতো দেশগুলোর সাথে চুক্তি বহাল থাকবে, তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা আগামী দিনগুলোতে পরিষ্কার হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই ‘শুল্ক যুদ্ধ’ শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদী সংকটের মুখে ঠেলে দিতে পারে।