কারাবন্দী পাকিস্তানের কিংবদন্তি অধিনায়ক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের স্বাস্থ্য ও কারাবাসের পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। ক্রিকেট বিশ্বে তাঁর সহযোদ্ধা ও প্রতিদ্বন্দ্বীরা এবার সরাসরি মানবিক আচরণের দাবিতে একজোট হয়েছেন। বিশ্বের ১৪ জন সাবেক আন্তর্জাতিক অধিনায়ক পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের কাছে চিঠি লিখে ইমরান খানের জন্য ‘ন্যূনতম মানবিক মর্যাদা, সুচিকিৎসা ও স্বচ্ছ আইনি প্রক্রিয়া’ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
এই উদ্যোগের খসড়া প্রণয়ন করেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক গ্রেগ চ্যাপেল। তাঁর সঙ্গে স্বাক্ষর করেছেন ইয়ান চ্যাপেল, সুনীল গাভাস্কার, মাইক ব্রিয়ারলি, ক্লাইভ লয়েড, কপিল দেব, অ্যালান বোর্ডার, ডেভিড গাওয়ার, মাইকেল আথারটন, নাসের হুসেইন, স্টিভ ওয়াহ, জন রাইট, কিম হিউজ ও বেলিন্ডা ক্লার্ক। রাজনৈতিক মতভেদ ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের ঊর্ধ্বে উঠে তাঁরা একটি মানবিক অবস্থান নিয়েছেন—যা ক্রিকেটের ‘ফেয়ার প্লে’ দর্শনেরই সম্প্রসারণ।
স্বাক্ষরকারী সাবেক অধিনায়কদের তালিকা
| ক্রম | নাম | দেশ | নেতৃত্বের সময়কাল (আনুমানিক) |
|---|---|---|---|
| ১ | গ্রেগ চ্যাপেল | অস্ট্রেলিয়া | ১৯৭৫–১৯৭৭ |
| ২ | ইয়ান চ্যাপেল | অস্ট্রেলিয়া | ১৯৭১–১৯৭৫ |
| ৩ | অ্যালান বোর্ডার | অস্ট্রেলিয়া | ১৯৮৪–১৯৯৪ |
| ৪ | স্টিভ ওয়াহ | অস্ট্রেলিয়া | ১৯৯৭–২০০৪ |
| ৫ | সুনীল গাভাস্কার | ভারত | ১৯৭৬–১৯৮৫ |
| ৬ | কপিল দেব | ভারত | ১৯৮২–১৯৮৭ |
| ৭ | মাইক ব্রিয়ারলি | ইংল্যান্ড | ১৯৭৭–১৯৮১ |
| ৮ | ডেভিড গাওয়ার | ইংল্যান্ড | ১৯৮২–১৯৮৯ |
| ৯ | মাইকেল আথারটন | ইংল্যান্ড | ১৯৯৩–১৯৯৮ |
| ১০ | নাসের হুসেইন | ইংল্যান্ড | ১৯৯৯–২০০৩ |
| ১১ | ক্লাইভ লয়েড | ওয়েস্ট ইন্ডিজ | ১৯৭৪–১৯৮৫ |
| ১২ | জন রাইট | নিউজিল্যান্ড | ১৯৮৭–১৯৯২ |
| ১৩ | কিম হিউজ | অস্ট্রেলিয়া | ১৯৭৯–১৯৮৪ |
| ১৪ | বেলিন্ডা ক্লার্ক | অস্ট্রেলিয়া (নারী দল) | ১৯৯৪–২০০৫ |
গ্রেগ চ্যাপেল তাঁর এক কলামে লিখেছেন, ইমরান খান কেবল মাঠের অধিনায়ক ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক মানসিক শক্তির প্রতীক। ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে শিরোপা জেতানোর পর তিনি ট্রফি হাতে সারা দেশ ভ্রমণ করেছিলেন—নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে নয়, বরং জাতিকে বিশ্বাস করাতে যে বড় স্বপ্ন দেখা যায় এবং তা বাস্তবও করা যায়।
চ্যাপেলের ভাষ্য অনুযায়ী, ইমরান খানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক প্রতিদ্বন্দ্বিতার হলেও ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধায় ভরপুর। ২০০৪ সালে লাহোরে এক নৈশভোজে ইমরান তাঁকে বলেছিলেন, রাজনীতিতে প্রবেশ তাঁর জন্য ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিষয় নয়; বরং পাকিস্তানকে সম্ভাবনার উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়ার এক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। তিনি ‘সাত বছরের চক্র’ তত্ত্বে বিশ্বাস করতেন—একাধিক ব্যর্থতার পরও অবিচল থাকার দর্শন। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর তিনি প্রধানমন্ত্রী হন।
তবে ২০২৩ সাল থেকে তিনি কারাবন্দী। তাঁর বিরুদ্ধে ১৮৬টিরও বেশি মামলা চলমান বলে জানা গেছে। বয়স ও মামলার বহর বিবেচনায় এই কারাবাস কার্যত দীর্ঘমেয়াদি বন্দিত্বে রূপ নিয়েছে। ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, তাঁর ডান চোখের দৃষ্টি গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং তাঁকে নির্জন সেলে রাখা হয়েছে—যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
চিঠিতে সাবেক অধিনায়কেরা স্পষ্ট করেছেন, তাঁদের এই আবেদন রাজনৈতিক অবস্থান নয়; এটি মানবিক ন্যায্যতার দাবি। তাঁরা চান—
-
ইমরান খান যেন তাঁর পছন্দমতো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সেবা পান;
-
পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত সাক্ষাৎ নিশ্চিত করা হয়;
-
আইনি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় থাকে।
ক্রিকেট দীর্ঘদিন ধরে কূটনৈতিক সেতুবন্ধনের মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে। ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের টানাপোড়েনের মাঝেও গাভাস্কার ও কপিল দেবের মতো কিংবদন্তিরা দ্বিধাহীনভাবে এই মানবিক উদ্যোগে যোগ দিয়েছেন—যা খেলাটির চিরন্তন মূল্যবোধেরই প্রতিফলন।
চ্যাপেল লিখেছেন, “ক্রিকেট মানে কেবল রান আর উইকেট নয়; ক্রিকেট মানে চরিত্র, ন্যায়বোধ ও পারস্পরিক সম্মান।” তাঁদের বিশ্বাস, সম্মিলিত কণ্ঠস্বর উপেক্ষা করা কঠিন। তাঁরা নিজেদের ‘উত্তরাধিকারের প্রহরী’ বলে উল্লেখ করেছেন—যাঁরা ন্যায়বিচারের আলো নিভতে দেবেন না।
ইমরান খান সারাজীবন ফেয়ার প্লের জয়গান গেয়েছেন। আজ তাঁর প্রাপ্য সেই একই ন্যায্যতা ও মানবিক আচরণ। ক্রিকেট বিশ্ব অন্তত সেই মৌলিক দাবিটুকুই তুলেছে—সভ্য সমাজের ন্যূনতম দায়িত্ব হিসেবে।