বাংলাদেশে বিভিন্ন সেবাখাতের কার্যক্রমে সমন্বয়ের অভাব সরকারের কার্যকারিতা ও সাধারণ জনগণের স্বার্থে গুরুতর প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ভূমি রেজিস্ট্রি এবং ধর্মীয় নিবন্ধন খাতে এই সমস্যা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে স্বার্থের সংঘাত ও ক্ষমতার লড়াইজনিত কারণে কার্যকর সমন্বয় ততক্ষণে সম্ভব হচ্ছে না, ফলে সেবাপ্রার্থীরা দৈনন্দিন সমস্যায় পড়ছেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের জন্য যন্ত্রপাতি বরাদ্দ দেয়, কারণ জাতীয় দুর্যোগে সার্বিক তদারকি এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। কিন্তু এই সংস্থা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়োগ, পদায়ন ও বদলিসহ প্রতিটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ফলশ্রুতিতে, তাদের কাজের ৯০ শতাংশ নির্দেশনা পাওয়া সত্ত্বেও কার্যকর সমন্বয় তৈরি হয় না।
তেমনই, দেশের ভূমি সংক্রান্ত সেবার জন্য দায়ী সাবরেজিস্ট্রার অফিস ভূমি নিবন্ধন, নামজারি ও অন্যান্য ভূমিসংক্রান্ত কাজ পরিচালনা করে। কিন্তু এই অফিস আইন ও বিচার বিভাগের অধীনে থাকায় ভূমি মন্ত্রণালয় এই সংস্থার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছে না। ফলে অফিসের কার্যক্রমে অনিয়ম, হয়রানি ও দেরি চলছে।
একইভাবে, মুসলিম সম্প্রদায়ের নিকাহ কার্যক্রম সম্পাদনকারী কাজী অফিসগুলোও আইন ও বিচার বিভাগের অধীনে থাকায় ধর্ম মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধান কার্যকর হচ্ছে না।
প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সমন্বয়হীনতার মূল কারণ মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে “স্নায়ুযুদ্ধ” এবং ক্ষমতার লড়াই। অতীতে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বিষয়গুলো সেবাপ্রার্থী জনগণের সুবিধার্থে সমন্বয় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তা কার্যকর হয়নি।
সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. ফিরোজ মিয়া বলেন, “প্রশাসনের অসংগতি দূর করলে জনগণের ভোগান্তি কমবে। বিদ্যমান এলোকেশন অব বিজনেজ সংশোধন করতে হবে, সরকারের শীর্ষ মহলকে কঠোর হতে হবে।”
বর্তমানে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদ জানান, “সাবরেজিস্ট্রার অফিসের অন্তত ৯০ শতাংশ কাজ ভূমিসংক্রান্ত, কিন্তু প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ আইন মন্ত্রণালয়ের। সমন্বয়হীনতার কারণে ভূমি মন্ত্রণালয় কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না। বিষয়টি সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনার পর সাবরেজিস্ট্রার অফিস ভূমি মন্ত্রণালয়ের আওতায় আনার প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছিল, কিন্তু আইন মন্ত্রণালয়ের আপত্তির কারণে তা স্থগিত হয়েছে।”
নিচের টেবিলে মূল সমস্যাগুলো সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো:
| সেবা/সংস্থা | কার্যক্রমের ধরন | বর্তমান অধীনে | সমস্যা | সমাধানের সুপারিশ |
|---|---|---|---|---|
| ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স | দুর্যোগ উদ্ধারকাজ | স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় | দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যর্থতা | সংস্থাকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনা |
| সাবরেজিস্ট্রার অফিস | ভূমি নিবন্ধন ও নামজারি | আইন ও বিচার মন্ত্রণালয় | ভূমি মন্ত্রণালয় কার্যকর নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না | ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনা |
| কাজী অফিস | বিয়ে/নিখাহ নিবন্ধন | আইন ও বিচার মন্ত্রণালয় | ধর্ম মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধান কার্যকর হচ্ছে না | ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্থানান্তর |
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যদি এসব সংস্থা যথাযথ মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনা হয় এবং কার্যক্রমে সমন্বয় তৈরি করা হয়, তবে সেবাপ্রার্থীদের ভোগান্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।