মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন বারুদ আর আগুনের গোলকায় আচ্ছন্ন। গত শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) ভোরে ইরান ভূখণ্ডে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বিমান হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরান যে বিধ্বংসী পাল্টা আক্রমণ শুরু করেছে, তার আঁচ লেগেছে প্রতিবেশী দেশগুলোতেও। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও কৌশলগত স্থাপনা লক্ষ্য করে ইরানের চালানো ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় একজন বাংলাদেশি প্রবাসীসহ মোট চারজন বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। এই ঘটনায় ওই অঞ্চলে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
আমিরাতে নিহতের সংখ্যা ও বর্তমান পরিস্থিতি
প্রাথমিক সংবাদ অনুযায়ী, শনিবার হামলার প্রথম দিনেই আরব আমিরাতে একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছিল। তবে আজ রবিবার (১ মার্চ) স্থানীয় গণমাধ্যম ও হাসপাতাল সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও তিনজন প্রাণ হারিয়েছেন। ফলে এই হামলায় দেশটিতে মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে চারজনে। নিহতদের মধ্যে একজন বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন, যা আমাদের জন্য অত্যন্ত শোকাবহ। এছাড়া বাকিদের মধ্যে একজন পাকিস্তানি এবং একজন নেপালি নাগরিক বলে শনাক্ত করা হয়েছে। এই হামলায় আহত হয়েছেন অন্তত ৫৮ জন, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
আমিরাত প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিরক্ষা পরিসংখ্যান
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক জরুরি বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরানের দিক থেকে ধেয়ে আসা আকাশপথের হুমকি মোকাবিলায় তারা তাদের উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় রেখেছে। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের এই আক্রমণ ছিল নজিরবিহীন এবং অত্যন্ত পরিকল্পিত। বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হলেও কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন লোকালয় এবং স্থাপনায় আঘাত হেনেছে।
নিচে আমিরাতের আকাশসীমায় শনাক্তকৃত ও ধ্বংসকৃত ইরানি সমরাস্ত্রের একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলো:
| সমরাস্ত্রের ধরন | শনাক্তকৃত সংখ্যা | ধ্বংস/ঠেকানো হয়েছে | লক্ষ্যভেদে সফল/ব্যর্থ |
| ব্যালিস্টিক মিসাইল | ১৬৫টি | ১৫২টি | ১৩টি (বিভিন্ন স্থানে আঘাত) |
| ক্রুজ মিসাইল | ০২টি | ০২টি | সম্পূর্ণ ব্যর্থ |
| ড্রোন (UAV) | ৫৪১টি | ৫০৬টি | ৩৫টি (আঘাত বা বিধ্বস্ত) |
সংঘাতের প্রেক্ষাপট ও প্রবাসীদের নিরাপত্তা
ইরান দাবি করেছে, তাদের এই পাল্টা আক্রমণ মূলত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একটি সতর্কবার্তা। বিশেষ করে কাতায়িব হিজবুল্লাহ এবং হুথি বিদ্রোহীদের মতো গোষ্ঠীগুলো এই হামলার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে। তবে এই যুদ্ধে প্রাণ হারাচ্ছেন নিরীহ অভিবাসী শ্রমিকরা, যারা জীবিকার তাগিদে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অবস্থান করছেন। আমিরাত সরকার জানিয়েছে, ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি এমন কিছু ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ আবাসিক এলাকায় পড়ার কারণেই এই হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
আবুধাবি ও দুবাইয়ের মতো শহরগুলোতে অবস্থানরত প্রবাসীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ দূতাবাস থেকেও প্রবাসীদের চলাফেরায় সাবধানতা অবলম্বন করতে এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার অনুরোধ জানানো হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীলতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তা কেবল প্রাণহানিই নয়, বরং ওই অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনীতি ও প্রবাসী রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, মার্কিন ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করে যদি পুনরায় ইরানে হামলা চালানো হয়, তবে আক্রমণের মাত্রা আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হবে। বিশ্ব সম্প্রদায় এখন গভীর উদ্বেগের সাথে পর্যবেক্ষণ করছে যে, এই সংঘাত কি কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে নাকি এটি বৃহত্তর কোনো বিশ্বযুদ্ধের রূপ নেবে।



