খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 20শে ফাল্গুন ১৪৩২ | ৪ই মার্চ ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সদ্য বিদায়ী প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ (ভেরি ইম্পর্ট্যান্ট পারসন বা ভিআইপি) হিসেবে ঘোষণা করে প্রকাশিত গেজেটটি নিয়ে ধূম্রজালের সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষমতা হস্তান্তরের ঠিক আগমুহূর্তে নিজের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা সুবিধা নিশ্চিত করতে জারি করা এই গেজেটটি বর্তমানে সরকারি মুদ্রণালয়ের (বিজি প্রেস) ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। দীর্ঘ সাত মাস দায়িত্ব পালনের পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র দুদিন আগে, অর্থাৎ ১০ ফেব্রুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে তাকে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ ঘোষণা করে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
নিয়ম অনুযায়ী, সরকার কর্তৃক প্রকাশিত সকল গেজেট বিজি প্রেসের ওয়েবসাইটে সর্বসাধারণের দেখার জন্য উন্মুক্ত থাকে। তবে ড. ইউনূসের এই গেজেটটি বর্তমানে সেখানে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বিজি প্রেসের উপপরিচালক মোহাম্মদ আবু ইউসুফ এ প্রসঙ্গে জানিয়েছেন যে, অনেক সময় সংশ্লিষ্ট সংস্থার বিশেষ নির্দেশনার কারণে কিছু গেজেট জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয় না। এক্ষেত্রেও সরকারি নির্দেশনা মেনেই ওয়েবসাইট থেকে এটি সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
এই গেজেটের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল দায়িত্ব ছাড়ার পর অধ্যাপক ইউনূসের জন্য স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স বা এসএসএফ-এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ‘বিশেষ নিরাপত্তা আইন ২০২১’-এর ক্ষমতা বলে গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর একটি বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়। সেই বিধিমালার আলোকে ১০ ফেব্রুয়ারির গেজেটে উল্লেখ করা হয় যে, দায়িত্ব হস্তান্তরের তারিখ থেকে পরবর্তী এক বছর পর্যন্ত ড. ইউনূস এসএসএফ নিরাপত্তা পাবেন।
নিচে বিশেষ নিরাপত্তা বিধিমালা ২০২৫-এর গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যসমূহ তুলে ধরা হলো:
| সেবার ক্ষেত্র | নিরাপত্তার ধরন ও সুযোগ-সুবিধা |
| নিরাপত্তার মেয়াদ | দায়িত্ব হস্তান্তরের তারিখ থেকে পরবর্তী ১ বছর। |
| নিরাপত্তা বাহিনী | স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ) এর সার্বক্ষণিক সুরক্ষা। |
| বাসভবন ও কার্যালয় | স্থায়ী ও অস্থায়ী বাসভবনের সার্বিক নিরাপত্তা তদারকি। |
| দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা | অগ্নিকাণ্ড বা ভূমিকম্পের মতো দুর্ঘটনায় এসএসএফ-এর সরাসরি সমন্বয়। |
| দর্শন নিয়ন্ত্রণ | বাসভবন ও কার্যালয়ে দর্শনার্থী ও যানবাহনের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ। |
| অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ | বাহিনীর কর্মকর্তা ছাড়া অনুষ্ঠানস্থলে অন্য কারো অস্ত্র বহনে নিষেধাজ্ঞা। |
অধ্যাপক ইউনূসের প্রেস সচিব শফিকুল আলম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানিয়েছেন যে, এই প্রক্রিয়ায় কোনো আইনি লঙ্ঘন হয়নি। তিনি ২০০১ সালের উদাহরণ টেনে বলেন, তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি লতিফুর রহমানের ক্ষেত্রেও অনুরূপ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তার মতে, এসএসএফ সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য এটি একটি প্রক্রিয়াগত বাধ্যবাধকতা মাত্র। তবে সমালোচকরা বলছেন, বিদায়ের মাত্র কয়েক দিন আগে তড়িঘড়ি করে নিজের জন্য এমন বিশেষ সুবিধার গেজেট করা এবং পরে তা ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে নেওয়া স্বচ্ছতার পরিপন্থী।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার শপথ গ্রহণ করার মাধ্যমে ড. ইউনূসের সরকারের মেয়াদ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়। এরপর ২৮ ফেব্রুয়ারি তিনি তার সরকারি বাসভবন ত্যাগ করেন। বর্তমানে তিনি তার ঘোষিত ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ হিসেবে এসএসএফ-এর সুরক্ষায় রয়েছেন।
তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, যে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় বিশেষ সুবিধা ভোগ করছেন, তা জনগণের চোখের আড়ালে কেন রাখা হচ্ছে? বিজি প্রেসের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এটি ‘সরকারি নির্দেশনা’ হলেও কোন পর্যায় থেকে এই গোপনীয়তার আদেশ এসেছে, তা নিয়ে জনমনে কৌতূহল কাটছে না।