খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 20শে ফাল্গুন ১৪৩২ | ৪ই মার্চ ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান রণক্ষেত্র এখন এক চরম স্নায়ুযুদ্ধে রূপ নিয়েছে, যেখানে একদিকে রয়েছে ইরানের আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের বহর, আর অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। গত কয়েক দিনের সংঘাতের ধরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি এখন মূলত একটি ‘সংখ্যার লড়াইয়ে’ পরিণত হয়েছে। কার অস্ত্রভাণ্ডার আগে শূন্য হবে—সেই সমীকরণের ওপরই নির্ভর করছে যুদ্ধের জয়-পরাজয়। বার্তা সংস্থা এএফপির এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই অসম প্রতিযোগিতার ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
গোয়েন্দা বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ‘মিন্টেল ওয়ার্ল্ড’-এর তথ্যমতে, যুদ্ধের প্রথম দুই দিনেই ইরান তার প্রতিবেশী ও উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তু অভিমুখে প্রায় ৪০০টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১,০০০টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। এই বিশাল আক্রমণ ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় রেখেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, তাদের প্রতিরক্ষা মজুত প্রায় সীমাহীন। তবে সামরিক বিশেষজ্ঞরা এই দাবির সাথে পুরোপুরি একমত হতে পারছেন না। তাদের মতে, শতভাগ সফল প্রতিরক্ষা যেমন অসম্ভব, তেমনি প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন ও মজুতও সীমিত।
একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস করতে সাধারণত অন্তত দুটি ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে হয়। নিচের টেবিলে এই অসম যুদ্ধের সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | ইরানের আক্রমণাত্মক সক্ষমতা | যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা |
| অস্ত্রের ধরণ | ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ মিসাইল, কামিকাজে ড্রোন। | থাড (THAAD), প্যাট্রিয়ট, অ্যারো ও আয়রন ডোম। |
| মজুত/উৎপাদন | কয়েক হাজার স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র। | থাড ইন্টারসেপ্টর উৎপাদন বছরে মাত্র ৯৬টি। |
| ব্যয় | ড্রোনের উৎপাদন খরচ অত্যন্ত কম। | প্রতিটি ইন্টারসেপ্টরের মূল্য কয়েক মিলিয়ন ডলার। |
| কৌশল | ঝাঁকে ঝাঁকে হামলা চালিয়ে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যস্ত রাখা। | লঞ্চার বা ‘তীরন্দাজ’কে ধ্বংস করে উৎক্ষেপণ ক্ষমতা কমানো। |
| সীমাবদ্ধতা | লঞ্চার ধ্বংস হলে আক্রমণ ক্ষমতা হ্রাস পায়। | ইন্টারসেপ্টর ফুরিয়ে গেলে আকাশ উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। |
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এই লড়াইকে ‘তীর নয়, তীরন্দাজকে গুলি করার’ কৌশলের সাথে তুলনা করেছেন। অর্থাৎ, আকাশ থেকে প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র খুঁজে ধ্বংস করার চেয়ে সেই উৎস বা লঞ্চারগুলো ধ্বংস করা অনেক বেশি কার্যকর। গত বছরের সংঘাতগুলোতে ইরানের অনেক উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা ধ্বংস করা হলেও তাদের উৎপাদন ক্ষমতা এখনও উদ্বেগের কারণ। ইসরায়েলি নিরাপত্তা সূত্রের মতে, ইরান অত্যন্ত দ্রুতগতিতে তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করছে।
ফরাসি গবেষক এতিয়েন মারকুজের মতে, বর্তমানে ইরানের হামলার তীব্রতা কিছুটা কমেছে। এটি দুটি কারণে হতে পারে—হয় তারা দীর্ঘ যুদ্ধের জন্য অস্ত্র জমা করছে, না হয় তাদের সমন্বিত হামলার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, আমেরিকান প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থার জন্য বছরে মাত্র ৬০০টি ইন্টারসেপ্টর তৈরি হয়। অথচ গত বছরের মাত্র ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল প্রায় ১৫০টি থাড মিসাইল ব্যবহার করে ফেলেছিল। এই হার বজায় থাকলে উন্নত বিশ্বের প্রতিরক্ষা মজুত দ্রুতই শেষ হয়ে আসার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কখনোই পুরোপুরি নিশ্ছিদ্র নয়। ইরান যদি ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের মতো দীর্ঘকাল ধরে নিম্ন-মাত্রার কিন্তু নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র চাপ বজায় রাখে, তবে তা পশ্চিমা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চরম অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ সৃষ্টি করবে। শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সমাধান না আসলে, এই ‘ক্ষেপণাস্ত্র বনাম প্রতিরক্ষা’ প্রতিযোগিতা মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘস্থায়ী ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারে।