খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৬ মার্চ ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিতিশীলতায় ইরানের দুই প্রধান বৈশ্বিক মিত্র রাশিয়া ও চীন তেহরানের ওপর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে তীব্র নিন্দা জানালেও, সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে এখন পর্যন্ত অনাগ্রহী। এই যুদ্ধে ইতোমধ্যেই এক হাজারের বেশি প্রাণহানি ঘটেছে এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ড পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একে ‘মানবিক নৈতিকতার নিষ্ঠুর লঙ্ঘন’ এবং চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই একে ‘শক্তির অপপ্রয়োগ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাসত্ত্বেও, তেহরানের বিপদে মস্কো ও বেইজিং কেন কেবল কূটনৈতিক নিন্দার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে রাশিয়া ও ইরান একটি ‘ব্যাপকভিত্তিক কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি’ স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির ফলে দুই দেশের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধি পেলেও এটি কোনো ‘পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ (Mutual Defense Treaty) নয়। রাশিয়ার চিন্তক প্রতিষ্ঠান ‘ভালদাই ডিসকাশন ক্লাব’-এর সদস্য আন্দ্রেই কর্তুনভের মতে, রাশিয়ার সাথে উত্তর কোরিয়ার যে ধরণের সামরিক চুক্তি রয়েছে, যেখানে এক দেশ আক্রান্ত হলে অন্য দেশ যুদ্ধে নামতে বাধ্য, ইরানের ক্ষেত্রে তেমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
রাশিয়া বর্তমানে ইউক্রেন সংকট এবং পশ্চিমাদের সাথে নিজস্ব জটিলতায় ব্যস্ত। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি মস্কো নিতে চাইছে না। তেহরান রাশিয়ার পক্ষ থেকে কার্যকর সামরিক পদক্ষেপ আশা করলেও, মস্কো মূলত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখেছে।
২০২১ সালে স্বাক্ষরিত ২৫ বছর মেয়াদী দীর্ঘমেয়াদী সহযোগিতা চুক্তির মাধ্যমে চীন ও ইরানের সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগে ইরানের অন্তর্ভুক্তি এবং জ্বালানি খাতে বেইজিংয়ের বিশাল বিনিয়োগ দুই দেশকে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করেছে। তবে চীনের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম মূল স্তম্ভ হলো ‘অন্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা’।
চীনের সিনহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জোডি ওয়েন মনে করেন, চীন এই সম্পর্ককে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও স্থিতিশীল হিসেবে দেখলেও সামরিক হস্তক্ষেপের প্রশ্নে একটি পরিষ্কার সীমারেখা টেনে রেখেছে। চীন মূলত মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজের ভাবমূর্তি গড়তে চায় এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখতে আগ্রহী।
| বৈশিষ্ট্য | রাশিয়ার অবস্থান ও ভূমিকা | চীনের অবস্থান ও ভূমিকা |
| চুক্তির ধরণ | ব্যাপকভিত্তিক কৌশলগত অংশীদারত্ব (২০২৫) | ২৫ বছর মেয়াদী দীর্ঘমেয়াদী সহযোগিতা (২০২১) |
| প্রধান স্বার্থ | প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও পরিবহন করিডর | জ্বালানি নিরাপত্তা ও বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্প |
| বাধ্যবাধকতা | সরাসরি যুদ্ধে নামার আইনি বাধ্যবাধকতা নেই | হস্তক্ষেপহীনতার নীতি বজায় রাখা |
| কূটনৈতিক অবস্থান | মার্কিন আধিপত্যের বিরুদ্ধে সংহতি | আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও মধ্যস্থতা |
| অর্থনৈতিক নির্ভরতা | সামরিক সরঞ্জাম ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় | ইরানের ৮৭.২% তেল রপ্তানি চীনে যায় |
তেহরান আশা করেছিল, ভারত মহাসাগরে যৌথ নৌ মহড়া এবং দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক মিত্রতা সংকটের সময়ে মস্কো ও বেইজিংকে তাদের পাশে সরাসরি দাঁড় করাবে। কিন্তু বাস্তব রাজনীতিতে দেখা যাচ্ছে, রাশিয়া ও চীন উভয়েই নিজ নিজ অর্থনৈতিক ও বৈশ্বিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সিঙ্গাপুরের নানিয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ডিলান লোহ-এর মতে, চীন ও রাশিয়ার ভূমিকা এখন মূলত ‘সুরক্ষামূলক’ এবং তারা বড় কোনো আঞ্চলিক বিপর্যয় এড়াতে মধ্যস্থতার পথ খুঁজছে।
শেষ পর্যন্ত ইরানকে হয়তো তার নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্কের ওপরই নির্ভর করতে হবে। মস্কো ও বেইজিংয়ের এই কৌশলী দূরত্ব প্রমাণ করে যে, বৃহত্তর বৈশ্বিক শক্তিসমূহ সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর চেয়ে কূটনৈতিক টেবিলে প্রভাব বিস্তার করতেই বেশি আগ্রহী।