এবিএমজাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: সোমবার, ২৩ মার্চ ২০২৬
ইতিহাস আমাদের বারবার একটি কথাই মনে করিয়ে দেয়-অন্যায় যতই শক্তির আবরণে ঢাকা থাকুক না কেন, সত্য একসময় প্রকাশিত হয়, ন্যায়বিচার একদিন প্রতিষ্ঠিত হয়ই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর এক সময় খুনিরা প্রকাশ্যে দম্ভভরে নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেছিল। কিন্তু সময়ের প্রবাহে সেই অপরাধের বিচার হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়- বিচার বিলম্বিত হতে পারে, কিন্তু তা চিরদিন অমীমাংসিত থাকে না।
ঠিক তেমনই, ২০২৪ সালের জুন ও জুলাই মাসে সংঘটিত সহিংস ঘটনাগুলো দেশজুড়ে গভীর উদ্বেগ, শোক এবং অসংখ্য প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে শতাধিক সাধারণ মানুষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য নিহত হওয়ার অভিযোগ উঠে এসেছে। এই সহিংসতার প্রকৃতি, পটভূমি ও দায়ীদের নিয়ে জনমনে যে সংশয় তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে প্রয়োজন একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত।
যদি এই ঘটনাগুলোর পেছনে কোনো সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র থেকে থাকে, তবে তা উদ্ঘাটন করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। কারণ আইনের শাসন কেবল অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়,এটি সত্য উদ্ঘাটনের একটি সুসংহত প্রক্রিয়া, যা সমাজে আস্থা ফিরিয়ে আনে।
সম্প্রতি মুহাম্মদ ইউনুস-এর একটি বক্তব্য, যেখানে তিনি ‘meticulous design’-এর মাধ্যমে মানুষ হত্যা করে সরকার পতনের অভিযোগের কথা উল্লেখ করেছেন বলে আলোচনায় এসেছে, তা জনপরিসরে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একইভাবে কথিত ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে পরিচিত চিহ্নিত জঙ্গি মাহফুজকে আন্তর্জাতিক পরিসরে উপস্থাপনের বিষয়টিও নানা বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। এসব বক্তব্য ও তথ্যের সত্যতা যাচাই অত্যন্ত জরুরি।কারণ গুজব, অর্ধসত্য বা রাজনৈতিক বক্তব্য কখনোই বিচারপ্রক্রিয়ার বিকল্প হতে পারে না।
অন্যদিকে আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া-এর একটি বক্তব্য,যেখানে ৫ আগস্ট সরকার পতন না হলে সশস্ত্র আন্দোলনের প্রস্তুতির ইঙ্গিত পাওয়া যায় বলে দাবি করা হচ্ছে- তাও আলোচনায় এসেছে। যদি এসব বক্তব্যের সঙ্গে সহিংস ঘটনার কোনো বাস্তব যোগসূত্র থাকে, তবে তা কেবল নিরপেক্ষ তদন্ত, তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ এবং বিচারিক বিশ্লেষণের মাধ্যমেই স্পষ্ট করা সম্ভব। এছাড়া জুলাই আন্দোলনে অংশ গ্রহনকারী অনেকেই ত্দের বীরত্ব গাথা গর্বের সাথে উপস্থাপন করতে গিয়ে অনেক ভয়াবহ, নির্মম সত্য বলে ফেলেছে যা আইন সিদ্ধ নয়। পরবর্তীতে নির্বাচনের আগের ১৮মাসে ড.ইউনুস সহ প্রায় অনেক সমন্বয়কেরদের বিরুদ্ধে লাগামহীন দূর্নীতি ও অনৈতিক সুবিধা গ্রহন সহ নানা অনিয়মের কথা প্রতিনিয়ত শোনা ও দেখা যাচ্ছে।
এখানে একটি মৌলিক নীতি স্মরণ রাখা জরুরি-কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন, আবার কাউকে প্রমাণ ছাড়া দোষী সাব্যস্ত করাও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। বাংলাদেশ-এর সংবিধান ও বিচারব্যবস্থা প্রত্যেক নাগরিকের জন্য এই ন্যায়সংগত ভারসাম্য নিশ্চিত করে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব হওয়া উচিত—
একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠন করে সকল পক্ষের বক্তব্য, তথ্য ও প্রমাণ যাচাই
গুজব ও বিভ্রান্তি প্রতিরোধে স্বচ্ছ তথ্যপ্রকাশ এবং সর্বোপরি, প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করা।
সত্য অনুসন্ধানই ন্যায়বিচারের প্রথম ধাপ। আর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলেই কেবল জাতি তার ক্ষত কাটিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে পারে। প্রতিশোধ নয়, প্রতিহিংসা নয়-আইনের শাসনই হোক আমাদের একমাত্র ভরসা, আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার।
তা’হলেই কেবল নতুন সরকার সকল বির্তকের উদ্ধে থেকে সুন্দর ভাবে দেশ পরিচালনা করতে পারবে। আর আপামর জনগনের প্রত্যাশা এ টুকুই।
সত্যের জয় অবসম্ভাবি।
লেখকঃ সম্পাদক ও প্রকাশক, খবরওয়ালা