রক্তাক্ত প্রভাতের এক নাম: চিশতি শাহ হেলালুর রহমান

একটি স্মরণ, একটি দায়বদ্ধতা
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কাল রাত্রি—বাংলার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় বিভীষিকা। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সেদিন যে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল, তা আজও আমাদের শিউরে তোলে। সেই নৃশংস অভিযানের নাম অপারেশন সার্চলাইট। আর এই অভিযানের প্রথম প্রহরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে ওঠে মৃত্যুপুরী। অসংখ্য ছাত্র, শিক্ষক, কর্মচারীর রক্তে রঞ্জিত হয় ক্যাম্পাস। সেই শহীদদের ভিড়েই এক উজ্জ্বল, অথচ বেদনাময় নাম—চিশতি শাহ হেলালুর রহমান।
বগুড়ার সন্তান হেলালুর রহমান ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন মেধাবী ছাত্র, দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী। থাকতেন সার্জেন্ট জহুরুল হক হল-এ, যার তৎকালীন নাম ছিল ইকবাল হল। তিনি শুধু একজন শিক্ষার্থীই ছিলেন না; ছিলেন একজন সচেতন, রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় তরুণ এবং সাহসী সাংবাদিক। দৈনিক আজাদ পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে লিখতেন। পাশাপাশি হল ছাত্র সংসদের পাঠাগার সম্পাদক এবং বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সহ-সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
স্বাধীনতার স্বপ্ন তখন তরুণ সমাজের রক্তে প্রবাহিত। সেই স্বপ্নেরই এক উজ্জ্বল বাহক ছিলেন হেলাল। ১৯৭১ সালের ৫ মার্চ ইকবাল হল প্রাঙ্গণে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন ও শপথ গ্রহণের অগ্রভাগে ছিলেন তিনি। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সম্পাদক হিসেবে তিনি উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ২৩ মার্চ পল্টন ময়দানে স্বাধীন বাংলা পতাকা দিবসের প্যারেডেও তিনি নেতৃত্ব দেন। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপেই ছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন নির্মাণের অদম্য প্রত্যয়।
কিন্তু ইতিহাস কখনো কখনো নির্মমভাবে থেমে যায়।
২৫ মার্চের সেই রাত—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আকাশে যখন গুলির শব্দ, আগুনের লেলিহান শিখা, আর আর্তনাদ একাকার—তখন জীবন বাঁচানোর শেষ চেষ্টায় হেলাল লাফিয়ে পড়েন হলের একটি শেডের ওপর। সারারাত উপুড় হয়ে পড়ে থাকেন। মৃত্যু যেন চারদিক থেকে তাঁকে ঘিরে রেখেছিল।
ভোরের আলো ফুটলে, ক্ষণিকের জন্য হয়তো মনে হয়েছিল—বেঁচে গেছেন। কিন্তু সেই আশাও বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ধরা পড়েন পাকিস্তানি সেনাদের হাতে। নিজের পরিচয় দেন—একজন সাংবাদিক হিসেবে, একজন ছাত্র হিসেবে। কিন্তু পরিচয় তখন অচেনা, মানবিকতা তখন নির্বাসিত।
হলের পেছনের সরু পথের পাশে, একটি গাছের নিচে দাঁড় করিয়ে তাঁকে গুলি করা হয়। প্রথম গুলিটি বুক ভেদ করার মুহূর্তে তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হয় এক অমর শব্দ—
“জয় বাংলা”।
এই একটি উচ্চারণেই যেন তাঁর জীবনের পূর্ণতা। এ যেন মৃত্যু নয়, এক অমরত্বে উত্তরণ।
হেলালের মরদেহের কোনো নির্দিষ্ট খোঁজ আজও পাওয়া যায়নি। হয়তো কোনো বধ্যভূমিতে মিশে গেছে, হয়তো নির্মমভাবে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। কিন্তু ইতিহাসে তাঁর অবস্থান অমলিন। তিনি বগুড়ার প্রথম শহীদদের একজন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম প্রহরের এক সাহসী আত্মদান।
আজ স্বাধীনতার এত বছর পর, আমরা যখন উন্নয়ন, অগ্রগতি আর সম্ভাবনার কথা বলি—তখন কি যথেষ্ট মনে রাখি সেই তরুণদের, যারা কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই জীবন উৎসর্গ করেছিলেন? চিশতি শাহ হেলালুর রহমান কেবল একটি নাম নয়; তিনি এক দায়বদ্ধতার প্রতীক—একটি প্রশ্ন, যা আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়।
আমরা কি তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে পেরেছি?
এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই হোক তাঁর প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধা।

লেখকঃ সম্পাদক ও প্রকাশক, খবরওয়ালা

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।