খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আবারও হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, যা বিশেষত এক বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘমেয়াদি অব্যবস্থাপনা, টিকাদান কর্মসূচিতে ছেদ এবং সেবার সীমাবদ্ধতার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে আসা প্রায় দুই কোটি এমআর (মিজেলস-রুবেলা) টিকা সরকারের হাতে জমা থাকলেও জনবল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবে তা শিশুদের মধ্যে প্রয়োগ করা সম্ভব হয়নি।
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর স্বাস্থ্য খাতের গুরুত্বপূর্ণ প্রোগ্রাম স্থগিত হয়ে যায়। পরবর্তী ডিসেম্বরে রাজস্ব খাত থেকে অর্থ নিয়ে এমআর টিকা কেনা হলেও, ২০২৫ সালের জুনের পর থেকে দীর্ঘ সময় টিকার সরবরাহ বন্ধ থাকে। এর ফলে প্রায় নয় মাস ধরে শিশুরা নিয়মিত টিকা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিশেষ করে এক বছরের কম বয়সী শিশুরা হাম ও রুবেলার মতো সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষা পাচ্ছে না, এমনকি দেড় বছর বয়সী অনেক শিশুর দ্বিতীয় ডোজও সম্পন্ন হয়নি।
১৯৮৮ সালে সরকারি উদ্যোগে দেশে এমআর টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়। সাধারণত শিশুরা ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ টিকা গ্রহণ করে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ জানান, “গত মাসে গ্যাভি বাংলাদেশে দুই কোটি ডোজ এমআর টিকা পাঠিয়েছে। কিন্তু জনবল নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকায় টিকা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আমরা এ বিষয়ে গ্যাভিকে চিঠি দিয়েছি।”
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল জানিয়েছেন, চলমান সংকট মোকাবিলায় টিকার জন্য প্রায় ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তিনি রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “গত ১১ দিনে এখানে ৩৩টি শিশু মারা গেছে। মূল কারণ ভেন্টিলেটরের অভাব ও যান্ত্রিক ত্রুটি।”
দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের তথ্য অনুযায়ী, ১২টি জেলায় রোগের উপস্থিতি দেখা গেছে। প্রধানত ঢাকা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, পাবনা, চট্টগ্রাম, যশোর ও নাটোর জেলায় বেশি শিশুর মধ্যে হাম শনাক্ত হয়েছে। অন্যান্য জেলা যেমন নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, গাজিপুর, ভোলা ও পটুয়াখালীর রোগীরা রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।
| জেলা | ভর্তি শিশু সংখ্যা | মৃত্যু শিশু সংখ্যা | মন্তব্য |
|---|---|---|---|
| ঢাকা | ২১০ | ১০ | রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ভর্তি |
| ময়মনসিংহ | ১০৬ | ৫ | চলতি মাসে বৃদ্ধি |
| রাজশাহী | ১২৩ | ১২ | মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল প্রতিবেদিত |
| চট্টগ্রাম | ৪৫ | ২ | স্থানীয় হাসপাতাল থেকে তথ্য |
| অন্যান্য | ১০০ | ৩ | নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, ভোলা, পটুয়াখালী |
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ হলো টিকাদান কর্মসূচিতে বাধা এবং শিশুদের অসম্পূর্ণ টিকা। এছাড়া ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ও অপুষ্টিও ভাইরাসের বিস্তারকে ত্বরান্বিত করেছে। গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশনের (গ্যাভি) সিএসও চেয়ারম্যান ড. নিজাম উদ্দিন বলেন, “একাধিক টিকার সংকট এবং ইপিআই কর্মসূচির বাধার কারণে নির্ধারিত সময়ে টিকা না পাওয়া শিশুদের মধ্যে হাম বেশি দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৩০-৩৫ শতাংশ পদ শূন্য থাকার কারণে কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।”
পরবর্তীতে স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় ও গ্যাভি যৌথ উদ্যোগে শীঘ্রই টিকার সরবরাহ পুনরায় চালু করার এবং দীর্ঘমেয়াদি সংকট প্রতিরোধ করার পরিকল্পনা করছে।